নিউজার্সিতে বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের বৈশাখী মেলা ও বাংলা সাংস্কৃাতিক উৎসব

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১০ মে ২০২৬, ১৩:০৭


বাংলার আবহমান সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর শেকড়কে ধারণ করেই আজ বাঙালি বিশ্ব নাগরিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়েও নিজেদের উৎস, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন গভীর মমতায়। আর সেই ধারাবাহিকতায় প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে দেশজ সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে বাংলা সংস্কৃতি হয়ে উঠছে আরও সমৃদ্ধ, আরও প্রাণবন্ত।
এই চেতনা ও প্রত্যয়েরই প্রতিফলন দেখা গেল বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব নিউজার্সি আয়োজিত বৈশাখী মেলা ও বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানে।
শনিবার, ৯ মে নিউজার্সির কল্টস নেক (Colts Neck) শহরে অনুষ্ঠিত এ বর্ণাঢ্য আয়োজনে অংশ নেন প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিপুল সংখ্যক মানুষ। পুরো অনুষ্ঠানস্থল যেন রূপ নেয় এক টুকরো বাংলাদেশে—রঙিন পাঞ্জাবি, শাড়ি, লোকজ সাজসজ্জা, বাংলা গান, আবৃত্তি, নৃত্য আর প্রাণখোলা আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে দিনব্যাপী আয়োজন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই উপস্থিত সবাইকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব নিউজার্সির প্রেসিডেন্ট ফায়জুর রহমান সাবু। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, “প্রবাসে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের ঐক্য। নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পৌঁছে দিতে হলে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন সেই প্রয়াসই করে যাচ্ছে।”
তিনি অনুষ্ঠান সফল করতে পৃষ্ঠপোষক, সংগঠক, স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটির সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জানান এবং প্রবাসে বাংলাদেশি সমাজের ঐক্য আরও সুদৃঢ় করতে সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের আলোচনায় বক্তারা বলেন, বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়—এটি বাঙালির চিরন্তন পরিচয়, আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণ এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। প্রবাসে এই ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য, উপস্থাপনা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে প্রাণ সঞ্চার করেন কমিউনিটির পরিচিত মুখ রীনা আমানুল্লাহ, ডা. ফারুক আজম, শামীমা হোসেন লিপি, শামা, মেহের নিগার, মীর চৌধুরী, শামীম, নাজনীন হোসেইন, সুবর্ণা খান, মারুফ আলম, ডা. বিল্লা এবং ডা. মনোয়ার হোসেন।
সংগঠনের সাবেক সভাপতিদের মধ্যে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ড মুহতাসিন বিল্লা,মীর চৌধুরী, গোলাম ফারুক ভুইয়া, নাহিদ চৌধুরী মামুন,ডা ফারুক আজম।
অনুষ্ঠানের একটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব নিউজার্সির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. মনোয়ার হোসেনকে সংবর্ধনা প্রদান। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিউজার্সিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃত্ব দিয়ে তিনি এখন নতুন কর্মস্থল ও আবাস হিসেবে ম্যারিল্যান্ডে যাচ্ছেন। তাঁর বিদায় উপলক্ষে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননা জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, ডা. মনোয়ার হোসেনের হাত ধরেই নিউজার্সিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা ও নিবেদিতপ্রাণ শ্রম কমিউনিটিকে একটি শক্ত ভিত দিয়েছে।
একই সঙ্গে সম্মান জানানো হয় ডা. লুসি হোসেনকেও, যিনি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সংগঠনের সঙ্গে থেকে নীরবে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। বক্তারা বলেন, তাঁর শ্রম, আন্তরিকতা ও নিরলস সম্পৃক্ততা সংগঠনকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
আলোচনা পর্ব শেষে ছিল মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রবাসী শিল্পীদের পরিবেশনায় বাংলা গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি এবং শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ছোট ছোট শিশুদের মুখে বাংলা গান ও কবিতা শুনে অভিভাবকদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি—কারণ এখানেই ভবিষ্যৎ, এখানেই শেকড়ের উত্তরাধিকার।
বাংলা নববর্ষের এই আয়োজন আবারও মনে করিয়ে দিল—ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, হৃদয়ের দূরত্ব নেই। প্রবাসের মাটিতে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার এই লড়াই শুধু নস্টালজিয়া নয়; এটি আগামী প্রজন্মের হাতে নিজের পরিচয় তুলে দেওয়ার এক গর্বিত প্রয়াস।
নিউজার্সির কল্টস নেকের এই বৈশাখী আয়োজন তাই কেবল একটি উৎসব নয়—এটি ছিল প্রবাসে বাঙালিত্বের এক উজ্জ্বল, আবেগময় এবং গর্বিত উচ্চারণ।