
নিউইয়র্কে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন এবার স্পষ্টভাবে পরিণত হয়েছে শহরের মূলধারার রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জন-আয়োজনে। টাইমস স্কয়ারে প্রথম দিনের জনসমুদ্র, কুইন্সে স্মারকগ্রন্থ মোড়ক উন্মোচন, এবং আগামী ২২ এপ্রিল আলবানি স্টেট ক্যাপিটলে সমাপনী আয়োজন—এই ধারাবাহিকতার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে নিউইয়র্কের মূলধারার রাজনীতিবিদদের সক্রিয় উপস্থিতি।
বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনী আবহকে সামনে রেখে শহর ও অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধি, সম্ভাব্য প্রার্থী, কমিউনিটি-সংযুক্ত নীতিনির্ধারক এবং রাজনৈতিক স্টাফরা বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। আয়োজকদের মতে, বাংলাদেশি-আমেরিকান ভোটারদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, কুইন্স ও জ্যাকসন হাইটস অঞ্চলে তাঁদের জনসংখ্যাগত শক্তি, এবং কমিউনিটি নেতৃত্বের সাংগঠনিক সক্ষমতা—সব মিলিয়ে বাংলা নববর্ষ এখন নিউইয়র্কের নির্বাচনী রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
১২ এপ্রিল কুইন্স পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট ডোনোভান রিচার্ডস জুনিয়র। তাঁর সঙ্গে শহরের বিভিন্ন পর্যায়ের মূলধারার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নির্বাচনী সংগঠক, কমিউনিটি লিয়াজোঁ এবং ভবিষ্যৎ প্রার্থিতার আলোচনায় থাকা কয়েকজন নেতাও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। উপস্থিত অনেকেই বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং নববর্ষের এই আয়োজনকে নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন।
বক্তব্যে ডোনোভান রিচার্ডস বলেন, কুইন্স আজ “লিটল বাংলাদেশ”-এর এক উজ্জ্বল বাস্তবতা। তিনি বলেন,
“বাংলাদেশি কমিউনিটি শুধু সাংস্কৃতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আমি যেমন জনগণের আস্থা নিয়ে এই নেতৃত্বে এসেছি, তেমনি খুব শিগগিরই বাংলাদেশি তরুণরাও নিউইয়র্কের বড় নির্বাচিত পদে উঠে আসবে।”
এই বক্তব্যে উপস্থিত প্রবাসী তরুণদের মধ্যে প্রবল উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়। অনেকেই এটিকে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশি-আমেরিকান সিভিক নেতৃত্বের প্রতি মূলধারার স্পষ্ট আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেন।
আহ্বায়ক রোকেয়া হায়দার তাঁর বক্তব্যে বলেন, নববর্ষের এই মঞ্চে নিউইয়র্কের মূলধারার রাজনীতিবিদদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন শহরের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তিনি বরো প্রেসিডেন্টসহ আগত সকল জনপ্রতিনিধিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ভবিষ্যতের নাগরিক উদ্যোগ, ভাষা-সংস্কৃতি ও শিক্ষা-ভিত্তিক কর্মসূচিতে তাঁদের পাশে থাকা প্রবাসী সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনআরবি ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিশ্বজিত সাহা বলেন, টাইমস স্কয়ারের প্রথম দিনের বিশাল সমাবেশের পর কুইন্সের এই রাজনৈতিক উপস্থিতি একটি নতুন বার্তা দিয়েছে—বাংলা নববর্ষ এখন প্রবাসী উৎসবের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনী ও নাগরিক আলাপের অংশ হয়ে উঠছে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ২৪৮ পৃষ্ঠার স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, যেখানে প্রবাসী বাংলা ইতিহাস, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকার নথিবদ্ধ করা হয়েছে। স্মারকগ্রন্থটি উপস্থিত অতিথিরা “বিশ্ববাংলার সাংস্কৃতিক দলিল” হিসেবে অভিহিত করেন।
স্মারকগ্রন্থ মোড়ক উন্মোচন পর্বে উপস্থিত ছিলেন আহ্বায়ক রোকেয়া হায়দার, সংগীত পরিচালক মহিতোষ তালুকদার তাপস, সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন (লিটন), প্রশাসক সৌম্য দাশগুপ্ত, সংগঠক নিরূপমা সাহা, তাপস সাহা, শশধর হাওলাদার, গোপা পাল মুক্তা, নুরুল বাতেন, গীতালি হাওলাদারসহ প্রবাসী সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
কুইন্স বরো প্রেসিডেন্টের হাতে বাংলা সংস্কৃতির প্রতীক একতারা তুলে দেন সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন (লিটন), আর বাংলাদেশের পতাকা-সংবলিত উত্তরীয় দিয়ে সম্মাননা জানান প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিশ্বজিত সাহা।
এদিকে আয়োজকেরা জানিয়েছেন, বাংলা নববর্ষের তৃতীয় ও সমাপনী পর্ব আগামী ২২ এপ্রিল নিউইয়র্ক স্টেট ক্যাপিটলে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নিউইয়র্ক স্টেটের আরও শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতাদের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এই তিন দিনের আয়োজনকে বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক মর্যাদা থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ধারাবাহিক রূপান্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে।