যে ভয়ে ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দের অভিযান স্থগিত করেছিলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ১৪ জুন ২০২৬, ২৩:০৩

ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল; কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই পরিকল্পনা স্থগিত করেন বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন গত মাসের শেষ দিকে গোপনে ফ্লোরিডার ট্যাম্পায় অবস্থিত ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড সদর দপ্তরে যান। সেখানে তাকে ইরানের ভিতরে স্থল সেনা পাঠিয়ে ইউরেনিয়াম জব্দ করার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং দেওয়া হয়। এই ইউরেনিয়ামই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির মূল উপাদান।
ব্রাসেলসে ন্যাটোর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে দ্রুত ফিরে এসে তিনি এই ব্রিফিংয়ে অংশ নেন বলে জানা গেছে। বিষয়টির জরুরি ও সংবেদনশীলতা থেকেই বোঝা যায়, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
পরবর্তীতে জেনারেল কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিকল্পগুলো সম্পর্কে অবহিত করেন। তবে সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্প সতর্কবার্তা পাওয়ার পর পরিকল্পনা থামিয়ে দেন। তাকে জানানো হয়, এই অভিযান ইরানের কঠোর প্রতিশোধের কারণ হতে পারে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কাও ছিল।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দ করতে পারে। তবে সামরিক উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং জটিল একটি অভিযান হবে। ইরানের বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনা যেমন ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোর্ডোতে এই ইউরেনিয়াম গভীর ভূগর্ভস্থ টানেলে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব স্থানে প্রবেশ করে সব ইউরেনিয়াম শনাক্ত ও নিরাপদে সরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হতে পারে। কিছু অংশ গ্যাস আকারেও থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
সূত্রগুলো জানায়, এই অভিযানের জন্য শত শত বিশেষ বাহিনী সদস্য প্রয়োজন হতো এবং ঝুঁকির মাত্রা ‘উচ্চ থেকে চরম’ পর্যায়ে ছিল। এমনকি সফল হলেও ব্যাপক মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।
অন্যদিকে, ইরানও বিকল্প কৌশল হিসেবে হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের আলোচনায় নতুন করে মতপার্থক্যের বিষয় সামনে এসেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আলোচনায় যেসব বিষয়ে সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণনার সঙ্গে ইরানের অবস্থানের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
তেহরানের দাবি, তারা কখনোই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে সম্মত হয়নি। পাশাপাশি যেকোনো চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে ইরানের স্থগিত থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলার অবিলম্বে অবমুক্ত করার দাবি জানিয়েছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ইউরেনিয়াম ধ্বংস ও অপসারণের বিষয়টি থাকলেও তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, এটা খুবই বিপজ্জনক ও জটিল পদার্থ, এটি সরানো সহজ নয়।
এর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বলেন, এটা মাটির নিচে পাহাড়ের গভীরে লুকানো আছে, কেউ এর কাছাকাছি যেতে পারবে না।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রায় ৯৭০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিভিন্ন পারমাণবিক স্থাপনায় গভীর ভূগর্ভস্থ টানেলে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব ইউরেনিয়াম ইসফাহান, নাতাঞ্জ ও ফোর্ডো কেন্দ্রগুলোতে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চাইলে বর্তমান মজুত ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
তবে পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সব ইউরেনিয়াম শনাক্ত ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হবে।

সূত্র: সিএনএন