
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন ক্র্যাকডাউনের অংশ হিসাবে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে দুর্ধর্ষ অপরাধী সহস্রাধিক। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- এই দুর্ধর্ষ অপরাধীর তালিকায় ১০ জনের বেশী বাংলাদেশির নাম রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অনেকে গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
আইসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় চার লাখ অভিবাসী গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে গুরুতর বা সহিংস অপরাধে জড়িতদের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও বেশ কিছু দুর্ধর্ষ অপরাধী রয়েছে। তবে, আইসের তালিকায় ১০ জনের বেশী বাংলাদেশির নাম রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে মানব ও মাদক পাচার, মানি লন্ডারিংসহ গুরুতর কিছু অভিযোগ রয়েছে।
আইস জানায়, ২০২৬ সালের শুরুতে আইসের অভিযান জোরদার করা হয়। শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসেই প্রায় ৩৬ হাজার গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে, যা মাসিক হিসেবের তুলনায় অনেক।
একটি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে আইসের অভিযানে সাধারণ অভিবাসীদের গ্রেপ্তারের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মোট গ্রেপ্তারের প্রায় ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি মানুষের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। অভিবাসন নীতি নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে এই পরিসংখ্যান নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রশাসন বলছে, তারা আইন প্রয়োগ করছে; অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রকৃত অপরাধীদের বদলে সাধারণ অভিবাসীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
আইসের দেওয়া শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী গ্রেপ্তারদের তিনটি বড় ভাগ রয়েছে। এরমধ্যে অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার জনের বিরুদ্ধে। অপরাধের রেকর্ড নেই ১ লাখ ৫৩ হাজার জনের। নতুন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে ১১ হাজার জনের। মোট গ্রেপ্তারের মধ্যে সহিংস বা গুরুতর অপরাধে জড়িতদের হার প্রায় ১৩-১৪ শতাংশের।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) জানিয়েছে, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, মাদক পাচার, প্রতারণা ও হামলার মতো বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এই অভিযানে আটক করা হয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকের নামও রয়েছে।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্রেপ্তার চলমান আইন প্রয়োগ অভিযানের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
বিভাগের ডেপুটি সহকারী সচিব লরেন বিস এক বিবৃতিতে বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও কয়েকজন গুরুতর অপরাধে জড়িত অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে শিশু নির্যাতনকারী, ধর্ষক এবং সহিংস অপরাধীরাও রয়েছে। তিনি বলেন, যারা দুর্বল শিশুদের ওপর হামলা চালায় বা নিরীহ মানুষের ক্ষতি করে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
ডিএইচএস আরও জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিবাসন আইন প্রয়োগ আরও কঠোর করা হয়েছে। সরকারি হিসাবে দাবি করা হয়েছে, তার প্রশাসনের সময়ে ইতোমধ্যে ৭ লাখ ১৩ হাজারের বেশি অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। ভিয়েতনামের নাগরিক তুয়ান থান নগুয়েন মিসৌরির সেন্ট লুইসে চারবার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ যৌন সম্পর্ক এবং দুইবার শিশু নির্যাতনের অপরাধে দণ্ডিত হন। হন্ডুরাসের নাগরিক এরিক কাস্তানেদা বারাহোনা নিউইয়র্কে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। মেক্সিকোর নাগরিক এফ্রাইন মেন্দেজ কাবরেরা ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে যৌন সহিংসতার অপরাধে দণ্ডিত হন। ভেনেজুয়েলার নাগরিক রনি রোজাস হার্নান্দেজ টেক্সাসের অস্টিনে শারীরিক আঘাতের কারণ হওয়া হামলার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। এছাড়া মেক্সিকোর রোনালদো রোজাস ফ্লোরেস ক্যালিফোর্নিয়ার সালিনাসে মিথ্যা আটক এবং স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে দণ্ডিত হন।
এদিকে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হওয়া অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশি নাগরিক কাজী আবু সাঈদকে কানসাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট স্কট এলাকায় গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ককে শোষণ, অবৈধ জুয়া পরিচালনা এবং জুয়া সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। শাহেদ হাসানকে নর্থ ক্যারোলিনার র্যালি শহর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গোপনে অস্ত্র বহন এবং দোকান থেকে চুরি করার অভিযোগ রয়েছে।
মোহাম্মদ আহমেদকে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও যৌন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে এমডি হোসেনকে। তার বিরুদ্ধেও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
ভার্জিনিয়ার চ্যান্টিলি শহর থেকে মাহতাবউদ্দিন আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গাঁজা বিক্রি এবং হ্যালুসিনোজেন জাতীয় মাদক বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। টেক্সাসের মার্লিন শহর থেকে নেওয়াজ খানকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে বিপজ্জনক মাদক সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
ফ্লোরিডার পেনসাকোলা শহর থেকে শাহরিয়া আবিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে চুরির অভিযোগে। মিশিগানের মাউন্ট ক্লেমেন্স শহর থেকে আলমগীর চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়েছে অবৈধভাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগে। ভার্জিনিয়ার মানাসাস শহর থেকে ইশতিয়াক রাফিকে গ্রেফতার করা হয়েছে অস্ত্র সংক্রান্ত অপরাধ এবং সিন্থেটিক মাদক রাখার অভিযোগে। অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহর থেকে কনক পারভেজকে গ্রেফতার করা হয়েছে প্রতারণার অভিযোগে।
ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তারা জানান, দেশজুড়ে চলমান এই অভিযান মূলত সেইসব অবৈধ অভিবাসীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের রেকর্ড রয়েছে এবং যাদের জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিভাগটি আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশ থেকে অপসারণ করা হবে।
নিউইয়র্কের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, নিউইয়র্কে আইসের দুর্ধর্ষ তালিকায় যেসব বাংলাদেশির নাম রয়েছে, তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন, যারা পেশায় ব্যবসায়ী। তাদের একজন একটি চেইন সুপারমার্কেটের মালিক এবং অন্যজন রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টর। এই দুজনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের (হুন্ডি) অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসার আড়ালে তারা দীর্ঘদিন থেকে হুন্ডি ব্যবসা করে আসছেন। তাদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। লং আইল্যান্ডে বসবাসরত ওই দুই বাংলাদেশি ইতিমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারে আইস একাধিকবার বাসায় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে বলে জানা গেছে।