সুপ্রিম কোর্টের রায় : ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি আরোপের ক্ষমতা বাতিল

আইনি জটিলতায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি

বিশেষ প্রতিবেদন
  ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪১

ট্রাম্প সরকার বিভিন্ন দেশের ওপর গত বছর উচ্চহারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ (আইইইপিএ)-এর জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র এ মাসে একটি বাণিজ্য চুক্তি সই করে। কিন্তু সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট শুক্রবার ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী নতুন শুল্কনীতি আরোপের ক্ষমতা বাতিল করায় বিশ্ব বাণিজ্য এক নতুন মোড় নিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে এই আইন প্রেসিডেন্টকে পাল্টা শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয় না। 
ট্রাম্প সরকারের নতুন শুল্কনীতি আরোপে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের জন্যও বড় সমস্যার সৃষ্টি করে। যার কারণে অনেক অসামঞ্জস্য শর্তে রাজি হয়ে বাণিজ্য চুক্তিতে সই করতে একপ্রকার বাধ্য হয় বাংলাদেশ। কিন্তু ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতি দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বাতিলের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্য আইনে (১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্ট) নতুন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যে ১৫০ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেন ট্রাম্প। আগামী মঙ্গলবার থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হবে। বৈশ্বিক পণ্য আমদানিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বাতিল হওয়ায় তড়িঘড়ি করে এই অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেন তিনি। পাশাপাশি অন্য আইনের আওতায় আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বের করতে নতুন তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাম্প, যা ভবিষ্যতে আবার শুল্ক আরোপের পথ খুলে দিতে পারে। 
তবে এখন বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ শুল্ক কমে ১০ শতাংশ হচ্ছে। এটিকে আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, দেশটির যে আইনে ট্রাম্প নতুন শুল্কের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানে আপাতত শুল্ক কমার বিষয়টি ছাড়া বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে তেমন স্বস্তির বার্তা নেই। অবশ্য দেশের শিল্প-কারখানাগুলোর কাজের পরিবেশ, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ঠিক রাখাসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি যদি ভালো থাকে, তাহলে প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে জানান, সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সই করা বাণিজ্য চুক্তিটি আপাতত স্থগিত হয়েছে। এখন সব দেশের মতো বাংলাদেশকে ১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সমঝোতা করে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসার। পরে নতুনভাবে আলোচনা করে দক্ষতার সঙ্গে চুক্তি করা যেতে পারে। 
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি সই করা বাণিজ্য চুক্তিটি দেশের জন্য ভালো ছিল না। 
দেশটির সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর শুল্ক নিয়ে চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া চুক্তির কী হবে, শুল্ক বাতিল হলেও অন্য শর্তগুলো বহাল থাকবে কি না– এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কয়েক হাজার কোটি টাকার ভাগ্যও নির্ভর করছে এই চুক্তির ওপর। তবে কোর্টের রায়ের পর বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বাতিল না হলেও আগের মতো আর শক্তিশালী থাকবে না। কারণ এটি টেকনিক্যালি সই করা একটি ডকুমেন্টস, যাতে উভয় দেশেরই প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ সরকার এই চুক্তির শর্ত নিয়ে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ পাবে। 
এ ব্যাপারে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরাও শুনেছি কংগ্রেসের সমর্থন না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের চুক্তি অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তবে ট্রাম্প নাকি বলেছেন, কোর্টে হেরে গেলেও দেশি আইনে শুল্ক আরোপ করা হবে। আগামী মঙ্গলবার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে বিস্তারিত জানতে পারব। তার পরই মন্তব্য করা যাবে।’ 
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম খবরের কাগজকে এ বিষয়ে বলেন, ‘‘প্রত্যেক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলাদা ‘ট্রেড ডিল’ থাকে। এটা মাত্রই বাতিল হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে চুক্তি হয়েছে তাতে কোনো প্রভাব পড়তে পারে কি না, তা আমরা পর্যালোচনা করছি।’’ 
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিগুলো অনেকটা সহজ। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। তার পরও বাণিজ্য চুক্তিটি বাতিল হওয়ায় বাংলাদেশের ওপর বিরূপ কোনো প্রভাব পড়ে কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২ আগে কখনো ব্যবহার করা হয়নি। এই আইনের আওতায় প্রেসিডেন্ট যেকোনো দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপ করতে পারেন। তবে ১৫০ দিনের পর শুল্ক বাড়াতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে। ট্রাম্প বলেছেন, তাদের কাছে বিকল্প আছে এবং তা শক্তিশালী বিকল্প।