মানসিক শান্তির খোঁজে ২০ বছরের ডাক্তারি পেশা ছেড়ে রুটির দোকান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৬

চিকিৎসক হিসেবে ২০ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবন। ছিল সম্মান, দায়িত্ব আর মানুষের চিকিৎসার মতো প্রধান কাজ। কিন্তু সেই পেশাতেই মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা পেশা ছেড়ে বাষ্পে রান্না করা পুরভরা রুটির দোকান খুলেছেন চীনের এক নারী। তিন বছর পর তার সেই দোকান শুধু টিকেই থাকেনি, বরং ভালোভাবে চলতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে খুলেছেন দ্বিতীয় দোকানও।
৪৮ বছর বয়সী ওই নারীর নাম তুং মিন। চীনের হুপেই প্রদেশের উহানে তার দোকান। চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি দ্বিতীয় দোকানটি চালু করেন।
তুং মিন ১৯৯৯ সালে উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর শেনচেনে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে মাকে একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনায় সহায়তা করতে উহানে ফিরে আসেন।
মা অবসর নেওয়ার পর তারা চিকিৎসাকেন্দ্রটি বন্ধ করে নিজ শহর থিয়ানমেনে ফিরে যান। সেখানে তুং একটি চিকিৎসকের পদে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি একটি ছোট কমিউনিটি হাসপাতালের আইনগত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
চিকিৎসক হিসেবে সেই সময়টিকে বেশ চাপের বলে জানিয়েছেন তুং। রোগী দেখার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নিয়মিত পরিদর্শনসহ নানা অচিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ সামলাতে হতো তাকে।
তার ভাষ্য, চীনে হাসপাতাল ও রোগীর সম্পর্ক অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো চিকিৎসাসংক্রান্ত বিরোধ দেখা দিলে হাসপাতালের আইনগত প্রতিনিধি হিসেবে পুরো দায়ও তাঁকেই নিতে হতো।
তুং বলেন, চিকিৎসক থাকাকালে প্রায়ই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা তার মনে হতো। অথচ এখন প্রতিদিন ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করেও তিনি মানসিকভাবে কোনো চাপ অনুভব করেন না। বরং ব্যস্ততা ও ক্লান্তির মধ্যেও নিজেকে অনেক বেশি সুখী মনে হয়।
২০২৩ সালে এক বন্ধুর পরিবারের ভাপে রান্না করা পুরভরা রুটির দোকান দেখে এই ব্যবসার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথমে তিনি একটি দোকানে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু একপর্যায়ে দোকানের রাঁধুনি হঠাৎ কাজ ছেড়ে দিলে নিজেই রুটি বানানো শেখার সিদ্ধান্ত নেন।
খুব দ্রুতই তিনি রুটি বানানোর কৌশল আয়ত্ত করে ফেলেন। কাজটি করতে গিয়ে আনন্দও পেতে শুরু করেন। একসময় চিকিৎসা পেশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে দোকান পরিচালনায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে শুরুতে তার পরিবার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। কারণ, চিকিৎসক পেশাকে পরিবার ও সমাজে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে দেখা হয়।
তুং অবশ্য অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেননি। তার ভাষায়, বয়স প্রায় ৫০ বছর। জীবনে অনেক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। তাই অন্যরা কী ভাবছে, তা নিয়ে তিনি আর ভাবতে চান না। নিজের পছন্দের জীবনই বেছে নিতে চান।
ধীরে ধীরে তার মা ও ভাইও সিদ্ধান্তটি মেনে নেন। এখন তারা মাঝেমধ্যে দোকানের কাজে তাকে সহযোগিতা করেন।
তুং বলেন, জীবনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। পরিবর্তন আনার জন্য কখনোই দেরি হয়ে যায় না। যতদিন চলাফেরা করতে পারবেন, ততদিন তিনি নিজের রুটির দোকান চালিয়ে যেতে চান।
চীনে চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তনের এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে চেচিয়াং প্রদেশের ইউউ শহরের একটি বড় হাসপাতালের চিকিৎসাগারে ১৩ বছর কাজ করা এক চিকিৎসকও চাকরি ছেড়ে পথের পাশে খাবারের দোকান শুরু করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ওই দোকান থেকে তাঁর আয় আগের মাসিক ১০ হাজার ইউয়ানের কম বেতনের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
চীনের চিকিৎসকদের নিয়ে কাজ করা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবও জানিয়েছে, চিকিৎসকদের সমস্যা শুধু শারীরিক ক্লান্তিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানসিক অবসাদও বড় সমস্যা। রোগী দেখার পাশাপাশি চিকিৎসকদের নানা অচিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ এবং রোগীর অভিযোগের ঝুঁকি সামলাতে হয়। অথচ তাঁদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও পরিশ্রমের তুলনায় আয় সবসময় সেই অনুপাতে হয় না।
সূত্র: দ্য সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট