প্লেনের জানালা কেন এত জটিল আর ঝুঁকিপূর্ণ!

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৬

প্লেনের জানালা সাধারণ কোনো কাচ বা প্লাস্টিকের টুকরো নয়। মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে স্বাভাবিকভাবেই তা প্রকৌশল, নিখুঁত বিজ্ঞান ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়ে তৈরি হয়।
বিবিসি লিখেছে, আকাশে ওড়ার সময় প্রচণ্ড বায়ুর চাপ, তীব্র তাপমাত্রা ও পাখির উড়ে এসে প্লেনে আঘাতের মতো মারাত্মক ঝুঁকি ঠেকিয়ে যাত্রীদের সুরক্ষিত রাখতে প্লেনের জানালা তৈরি হয় জটিল ও সূক্ষ্ম প্রযুক্তিতে।
গেল মে মাসের শেষ সপ্তাহে লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘জিকেএন অ্যারোস্পেস’ কোম্পানির এক রাসায়নিক সংরক্ষণ ট্যাংকে অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। ট্যাংকটিতে ৭ হাজার গ্যালনেরও বেশি বিষাক্ত পদার্থ সংরক্ষিত ছিল।
প্লেনের জানালাসহ এভিয়েশন খাতের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে থাকে জিকেএন অ্যারোস্পেস। উজ্জ্বল ধাতব ট্যাংকটির অভ্যন্তরে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মীরা বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি গুরুতর।
ট্যাংকটি বিস্ফোরিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যার ফলে এর ভেতরে থাকা ‘মিথাইল মেথাক্রিল্যাট’ বা এমএমএ নামের বিষাক্ত রাসায়নিকটি আশপাশের জনবসতিতে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দেখা দেয়।
প্লাস্টিক উৎপাদনে ব্যবহৃত যৌগটি ত্বক ও ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর ও চরম উত্তেজনাকর।
ট্যাংকের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় বা এর চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ ট্যাংকের ভেতরের তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা ছিল ওই ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্তই।
ঝুঁকি এড়াতে গার্ডেন গ্রোভ শহরের ৫০ হাজারেরও বেশি বাসিন্দাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ট্যাংকটি ঠাণ্ডা করতে ওপর থেকে পানি ছিটাতে শুরু করেন। স্থানীয় ফায়ার প্রধানের তথ্য অনুসারে, একপর্যায়ে ট্যাংকটি ‘ফুলে উঠেছিল’।
এতে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। ঘটনার কয়েক মাস পর অগাস্টে জিকেএন ও স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে একটি ১০ কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা ওই সময় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া বাসিন্দাদের দেওয়া হবে।
ওই ঘটনায় প্ল্যান্টটিতে প্লেনের জানালা তৈরির কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও তা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি।
এ ঘটনায় মৃদু ঝাঁকি লেগেছে বৈশ্বিক প্লেন উৎপাদন শিল্পে। যার কারণ, জিকেএন বিশ্বের সেই হাতে গোনা গুটিকয়েক কোম্পানির মধ্যে অন্যতম যারা নিখুঁত প্রকৌশল ও সুরক্ষার জন্য প্লেনের জানালা তৈরি করে থাকে।
জিকেএন-এর ব্রিটিশ মূল কোম্পানি ‘মেলরোজ ইন্ডাস্ট্রিজ’-এর বিবৃতি অনুসারে, গার্ডেন গ্রোভ প্ল্যান্টের উৎপাদন কার্যক্রম বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বা ৫০ শতাংশে নেমেছে।
২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কারখানাটি পূর্ণ উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি জিকেএন।
এভিয়েশন শিল্প বিশ্লেষক মারিসা গার্সিয়া বলেছেন, “গুরুত্বপূর্ণ এ জানালা সরবরাহের ক্ষেত্রে তারা হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির মধ্যে একটি।
“এভিয়েশন সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন দুর্বল দিকের একটি হল এ ধরনের কাজ করার জন্য যোগ্য কোম্পানির সংখ্যা খুবই কম এবং যখন কোনো ভুল হয় তখন তা পুরো সিস্টেমকেই ওলোটপালট করে দেয়।”
বোয়িং বলেছে, তারা ‘যে কোনো প্রভাব প্রশমিত করার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে’ এবং এই উৎপাদন ঘাটতিকে গোটা শিল্প খাতের সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে। কোম্পানিটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা আমাদের সরবরাহকারীকে সহায়তা করছি।”
এদিকে, এয়ারবাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি।”
পরামর্শক কোম্পানি ‘অ্যারোডাইনামিক অ্যাডভাইজরি’র বিশেষজ্ঞ মাইক স্টেনজেল বলেছেন, ‘বর্তমান সময়ে এসে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে বিভিন্ন এয়ারলাইন যত দ্রুত নতুন প্লেন চাইছে, তত দ্রুততার সঙ্গে হাতে পাচ্ছে না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে পুরনো প্লেনগুলোই অনেক দিন ধরে চালাচ্ছে’।
স্টেনজেল বলেছেন, প্লেনের জানালা নির্মাতা কোম্পানি সীমিত সংখ্যক থাকলেও এই খাতে কঠোর ও জটিল নিয়মকানুনের বেড়াজাল থাকায় নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির পক্ষে সহজে বাজারে প্রবেশ করাও বেশ কঠিন।
“একজন নতুন সরবরাহকারীর ওপর ভরসা করতে বা তাদের দিকে মনোযোগ সরাতে বেশ কিছুটা সময় লাগতে পারে।”
তার ভাষ্য, এ পরিস্থিতির কারণে প্লেন নির্মাতা কোম্পানি ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য যাদের ওপর তারা নির্ভর করে তাদের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য ধরে রাখার জটিল লড়াই তৈরি হয়।
একটি প্লেনের জানালা তৈরিতে ঠিক কী ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে সে সম্পর্কে ফরাসি কোম্পানি ‘স্যঁ-গোবা অ্যারোস্পেস’-এর জেনারেল ম্যানেজার জঁ-এরিক ভার্মন্ট বলেছেন, “আমরা বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক প্লেন এবং হেলিকপ্টারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিই।”
প্লেনের জানালাকে এভিয়েশন পরিভাষায় ‘ট্রান্সপারেন্সিজ’ বলে।
ভার্মন্ট বলেছেন, প্লেনের কেবিনের ভেতরের যাত্রীদের আসনের পাশের ডিম্বাকৃতির বিভিন্ন জানালা প্লাস্টিকভিত্তিক উপাদান দিয়ে তৈরি হয়।
“আপনি এক অ্যাক্রেলিক শিট দিয়ে শুরু করবেন। এরপর সঠিক আকারে কেটে সেটাকে নির্দিষ্ট রূপ দেবেন।”
স্যঁ-গোবার একজন মুখপাত্র বলেছেন, জিকেএন-এর মতো তাদের কোম্পানিতে ‘এমএমএ’ সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাত করা হয় না; বরং তারা পলিমারাইজড এমএমএ বা অ্যাক্রেলিকের শিট সরাসরি কিনে নেন।
ভার্মন্ট বলেছেন, যাত্রীদের বাইরের দুনিয়া আরও বড় পরিসরে দেখার সুযোগ করে দিতে প্লেন নির্মাতারা আজকাল কেবিনের বিভিন্ন জানালা আরও বড় আকারে চাইছেন।
এটা প্লেনের বড় এক বাণিজ্যিক আকর্ষণ বা সেলিং পয়েন্ট। তবে বড় জানালাগুলো ছোটগুলোর মতো একই রকম শক্ত ও টেকসই কি না তা নিশ্চিতের জন্য অতিরিক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন।

উচ্চতায় প্লেনের স্বাভাবিক চাপের তুলনায় বহুগুণ বেশি চাপ প্রয়োগ করে স্যঁ-গোবা তাদের জানালাগুলোর মান পরীক্ষা করে।
অ্যাক্রেলিক দিয়ে তৈরি কেবিনের এসব জানালা দুটি স্তর দিয়ে গঠিত হয়। এর যে কোনো একটি স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জানালাটি টিকতে পারবে কি না তা নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন পরীক্ষা চালায় স্যঁ-গোবা।
ভার্মন্ট বলেছেন, ককপিটের বিভিন্ন জানালা সম্পূর্ণ আলাদা।
এগুলো সাধারণ কাচ দিয়ে তৈরি, যা পটাশিয়াম যোগের মাধ্যমে রাসায়নিকভাবে মজবুত করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় কাচের ছোট সোডিয়াম আয়নগুলোর জায়গায় বড় আকারের পটাশিয়াম আয়ন প্রতিস্থাপন করা হয়, যা কাচের আণবিক গঠনকে আরও মজবুত করতে সাহায্য করে। উৎপাদনের সময় যখন এটা ঠান্ডা হয় তখন তা অতিরিক্ত শক্ত ও ঘন বিন্যাসে সংকুচিত হয়।
আধুনিক কিছু প্লেনে বাঁকানো বা কার্ভড ককপিটের জানালাও ব্যবহৃত হয়, যা প্লেনটিকে আরও মসৃণ করে তোলে ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সাহায্য করে।
তবে বাঁকানো ককপিটের জানালা তৈরি করা বেশ কঠিন। কারণ সামান্য কোনো বিকৃতি বা ত্রুটিও পাইলটের পরিষ্কার চোখে ধরা পড়ে যায়।
চূড়ান্ত পণ্যে যাতে এ ধরনের কোনো ত্রুটি না থাকে তা নিশ্চিতের জন্য কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা চালানো হয়।
ভার্মন্ট বলেছেন, সব প্লেনের জানালারই আঘাত সহ্য করার সক্ষমতা থাকতে হবে। তবে প্লেনের সামনের অংশে থাকা ককপিটের জানালাগুলো পাখির আঘাতের ঝুঁকিতে বেশি থাকে, যেখানে ‘ আসল সমস্যা পাখির গতি নয়, বরং প্লেনের গতি’।
এ হুমকি ঠেকাতে স্যঁ-গোবা তাদের জানালাগুলোর সক্ষমতা যাচাই করতে অসংখ্য সিমুলেশন ও ‘একটি মাঝারি আকারের পাখির আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তব পরীক্ষা’ পরিচালনা করে।
ভার্মন্ট বলেছেন, “আপনি যদি কোনো শিলাবৃষ্টির মধ্যে পড়েন বা যথেষ্ট বড় আকারের কোনো পাখির সঙ্গে ধাক্কা লাগে তবে প্লেনের বাইরের স্তরটি ফেটে যেতে পারে। ককপিটের জানালাগুলো এ বিষয়গুলো মাথায় রেখেই ডিজাইন করা হয়।”
সম্প্রতি লন্ডন থেকে উড্ডয়ন করা এক প্লেনের ককপিটের জানালায় ফাটলের ঘটনা ঘটেছিল। মাঝ আকাশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলেও প্লেনটি নিরাপদে অবতরণ করেছে।
ভার্মন্ট বলেছেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে’, তবে স্যঁ-গোবার তৈরি জানালাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনো ঘটনার মুখে পড়েনি।
পরামর্শক মাইক স্টেনজেল বলেছেন, “আপনি স্পষ্টতই এমন পৃষ্ঠ নিয়ে কাজ করছেন, যা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশের সংযোগস্থলে অবস্থান করে। আর ঠিক এ কারণেই এগুলো নিখুঁত ও উন্নত প্রযুক্তির পণ্য।”