এভারেস্টের হিমবাহ গলছে , বিস্ময়কর তথ্য জানালেন বিজ্ঞানীরা

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১১

হিমালয় অঞ্চলে সম্প্রতি একটি হিমবাহের অংশ ধস থেকে নেপালে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী পাহাড়ি ঢল ও কাদাপানির আকস্মিক বন্যা পৃথিবীর জন্য প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগের অপেক্ষাকৃত নতুন একটি দিক তুলে ধরেছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন জলবায়ু ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের সীমান্তে ওই পাহাড়ি ঢল ও কাদাপানির বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনো নিখোঁজ পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।
জলবায়ু ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে কথা বলছেন। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা যে গতিতে বাড়ছে, তাতে সারা বিশ্বেই হিমবাহ গলতে শুরু করেছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য বিজ্ঞানীরা নানা কারণকে দায়ী করেছেন।
গবেষকেরা তাঁদের গবেষণা প্রতিবেদনটি ‘রিজিওনাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’ সাময়িকীতে প্রকাশ করেছেন।
বসন্তে পর্বতারোহণের মৌসুমে হাজারো পর্বতারোহী, গাইড ও সহায়ক কর্মী এ বেজ ক্যাম্পে জড়ো হন। তখন ক্যাম্পটি জমজমাট এক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে থাকে এসপ্রেসো কফির ক্যাফে, বড় পর্দার টিভি, উচ্চগতির ইন্টারনেট, গরম পানির ঝরনা, এমনকি তাঁবুর মেঝে গরম রাখার ব্যবস্থাও থাকে।


গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে ৫০ দিন ধরে নেপাল অংশের বেজ ক্যাম্পের প্রায় ১ হাজার ৬০০টি তাঁবুতে রান্না, তাঁবু গরম রাখা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে ৮২৪টি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার, ১৮ হাজার ৯৩৫ লিটার কেরোসিন ও ৫ হাজার ১৩০ লিটার পেট্রল খরচ হয়েছে।
মানুষের মূত্র থেকে উৎপন্ন তাপও হিসাবের সঙ্গে যোগ করলে মোট উৎপাদিত শক্তির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ লাখ ৪৯ হাজার ১৭৪ মেগাজুল। এ পরিমাণ শক্তি আনুমানিক ২ হাজার ৪৯২ টন বরফ ও তুষার গলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অবশ্য হিসাবের ত্রুটির সীমা ধরলে পরিমাণটি ১ হাজার ৯৬৪ থেকে ৩ হাজার ২০ টনের মধ্যে হতে পারে।
এ পরিমাণ পানি একটি অলিম্পিকের মাপের সুইমিংপুল ভরে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট অথবা এতে প্রায় ৮৩টি ট্যাংকার ট্রাক কিংবা প্রায় ১৬ হাজার ৭০০টি সাধারণ বাথটাব ভরা যাবে।
অতিরিক্ত উচ্চতায় শরীরে পানিশূন্যতা এড়াতে পর্বতারোহী ও গাইডরা প্রচুর পরিমাণে পানি পান করেন। ফলে দিনে সব মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার লিটার মূত্র উৎপন্ন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এ মূত্রও নিজেই একটি উল্লেখযোগ্য তাপের উৎস।
কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করে তা নিচে নামিয়ে আনা হলেও বিপুল পরিমাণ মূত্র সরাসরি হিমবাহের ওপরই ফেলে দেওয়া হয়। গবেষকেরা হিসাব করে দেখেছেন, শুধু এ মূত্রের তাপেই এক মৌসুমে প্রায় ১৫৪ টন বরফ গলে যেতে পারে।
স্যাটেলাইটের তথ্যেও বেজ ক্যাম্পের আশপাশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির আরও বিস্তৃত প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাটের উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, বেজ ক্যাম্প এলাকার তাপমাত্রা বছরে গড়ে ০ দশমিক ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। খুম্বু হিমবাহে বেজ ক্যাম্পের আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে হার রেকর্ড করা হয়েছে, এটি তার প্রায় দ্বিগুণ।
নেপালের ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের জ্যেষ্ঠ জরিপবিদ কিম লাল গৌতমসহ গবেষক দলের সদস্যরা বলেছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত প্রভাব সম্ভবত এর চেয়েও বেশি। কারণ, তাঁদের (গবেষক) হিসাবের মধ্যে হেলিকপ্টার চলাচল থেকে উৎপন্ন তাপ, পর্বতারোহীদের শরীরের তাপ ও সরঞ্জাম বহনের কাজে ব্যবহৃত ইয়াকের শরীর থেকে উৎপন্ন তাপ ধরা হয়নি।
গবেষকেরা তাঁদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনই এভারেস্টের হিমবাহ গলার প্রধান কারণ। তবে তাঁরা বিশেষভাবে এ–ও উল্লেখ করেছেন, দ্রুত গলে যাওয়া একটি হিমবাহের ওপর বছরের পর বছর হাজার হাজার মানুষকে জড়ো করা দীর্ঘ মেয়াদে চালিয়ে যাওয়াও ঠিক নয়।