প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-মেয়র মামদানি সাক্ষাৎ

গ্রেসি ম্যানশনে এক অস্বাভাবিক বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:১৮

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার নিউইয়র্ক শহরের মেয়র জোহরান মামদানির সরকারি বাসভবন গ্রেসি ম্যানশনে গিয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেছেন। এই সাক্ষাৎ কেবল একটি রাজনৈতিক সৌজন্য বিনিময় ছিল না, বরং এমন দুই নেতার মধ্যে ঘটেছে যাঁরা একসময় পরস্পরকে "ফ্যাসিবাদী" ও "সাম্যবাদী" বলে আক্রমণ করেছিলেন। রিপাবলিকান জাতীয় সম্মেলনে অভিবাসী-বিরোধী প্রচারণা চালানো ট্রাম্প এবং কুইন্স থেকে উঠে আসা সাবেক আইনসভা সদস্য সমাজতান্ত্রিক মামদানির এই ঘনিষ্ঠতা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছেও বিস্ময়কর ঠেকছে।
সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, গ্রেসি ম্যানশনে তিনি বিভিন্ন মেয়রকে দেখেছেন—কেউ ভালো, কেউ মন্দ—এবং আশা প্রকাশ করেন মামদানি একজন ভালো মেয়র হিসেবে প্রমাণিত হবেন। এই মন্তব্যকে অনেকেই স্বভাবসুলভ ট্রাম্পীয় প্রশংসা-মিশ্রিত কটাক্ষ হিসেবেই দেখছেন—যেখানে প্রশংসার আড়ালে একধরনের তদারকির সুরও স্পষ্ট।
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল অভিবাসন নীতি এবং কুইন্সে একটি আবাসন প্রকল্পের জন্য ফেডারেল সহায়তা প্রাপ্তি। এই সাক্ষাৎ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ১৯৮১ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের এড কচের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এটিই কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথম গ্রেসি ম্যানশন সফর।
মামদানি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে হাইতিয়ান অভিবাসীদের বৈধ মর্যাদা সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন—এমন এক সময়ে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় সাড়ে তিন লাখ হাইতিয়ান অভিবাসীর নির্বাসন সুরক্ষা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। নিউইয়র্কের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোয় হাইতিয়ান কমিউনিটির গুরুত্বের কথাও তিনি প্রেসিডেন্টকে স্মরণ করিয়ে দেন বলে জানান।
আলোচনায় আরও একটি বিষয় ছিল সানিসাইড ইয়ার্ড প্রকল্প, যেখানে রেললাইনের ওপর প্রায় বারো হাজার নতুন আবাসন ইউনিট ও ত্রিশ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে একুশ বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল অনুদান চাইছেন মামদানি। তাঁর ভাষায়, এই প্রকল্প যেন শহরের বুকে একেবারে নতুন একটি পাড়া গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ। বৈঠকে সিটি হল ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে এই বিষয়ে আলোচনার একটি নতুন পর্যায় শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে মেয়র জানান।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসরায়েল প্রশ্নে মামদানির অবস্থানে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা নমনীয়তা লক্ষ করা গেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরের প্রতিবাদ নিয়ে গ্রীষ্মে যে কড়া অবস্থান তিনি নিয়েছিলেন, সম্প্রতি তা থেকে কিছুটা সরে এসেছেন বলে মনে করা হচ্ছে—যদিও গাজায় যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে নেতানিয়াহু সম্পর্কে তাঁর ও ট্রাম্পের অবস্থান এখনও ভিন্ন থেকে গেছে।
দুই নেতার এই সম্পর্কের সূচনা গত নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে প্রথম সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে, এরপর ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে আরেকটি ব্যক্তিগত বৈঠক এবং নিয়মিত ফোন ও বার্তা আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সম্পর্ক ক্রমেই গাঢ় হয়েছে। ট্রাম্পের জন্মস্থান কুইন্স হওয়ায় এবং নির্মাণ ব্যবসার সঙ্গে তাঁর পুরনো যোগসূত্রকে কাজে লাগিয়ে মামদানি সচেতনভাবেই এই সাধারণ ভূমির ওপর সম্পর্ক গড়ে তুলছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
তবে এই সৌহার্দ্যের মধ্যেও সমালোচনার সুর একেবারে অনুপস্থিত নয়। অপরাধ দমনে আরও কঠোর পদক্ষেপ এবং সহিংস অবৈধ অভিবাসীদের নির্বাসনের দাবি বারবার তুলেছেন ট্রাম্প। শহরের করের বোঝা নিয়েও তাঁর অসন্তোষ পুরনো—বিশেষত মামদানি যখন দ্বিতীয় বাড়ির ওপর নতুন কর আরোপ করছেন। এপ্রিল মাসে মেয়রের প্রথম একশ দিনের মূল্যায়নে ট্রাম্প ম্যানহাটনকে পরিচ্ছন্ন করার ও কর কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন, নয়তো মানুষ শহর ছেড়ে চলে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে অবস্থানরত ট্রাম্প তাঁর সফরের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রেসি ম্যানশনকে তাঁর প্রিয় স্থানগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেন এবং বহু বছর ধরে সেখানে ভালো-মন্দ নানা মেয়রের সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা স্মরণ করেন।
রাজনৈতিক দিক থেকে ভিন্ন মেরুর দুই মানুষের এই ক্রমাগত সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাৎ নিউইয়র্কের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে—যেখানে আদর্শগত বিরোধিতা প্রায়শই ব্যবহারিক রাজনীতির প্রয়োজনে পথ ছেড়ে দেয়।