ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে বিমানের ফ্লাইট চালু : বাস্তবে কতদূর

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৬ আগস্ট ২০২৬, ২০:০৪


নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে এটি প্রায় দুই দশকের পুরোনো একটি স্বপ্ন- নিজ দেশের পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে চড়ে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় যাওয়া। মাঝখানে দোহা, দুবাই, আবুধাবি, ইস্তাম্বুল কিংবা অন্য কোনো বিমানবন্দরে দীর্ঘ ট্রানজিট নয়; সরাসরি কিংবা অন্তত বিমানের নিজস্ব ফ্লাইটে নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশের পথে যাত্রা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন অনেক প্রবাসীর কাছেই পরিণত হয়েছে এক ধরনের ‘আষাঢ়ে গল্পে’।
সরকার এসেছে, সরকার গেছে। মন্ত্রী বদলেছেন, বিমানের ব্যবস্থাপনা বদলেছে, বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হয়েছে। আর প্রতিবারই কোনো না কোনো সময় শোনা গেছে, ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট আবার চালু হচ্ছে, আলোচনা চলছে, প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, অনুমোদন মিললেই ফ্লাইট শুরু হবে।
কিন্তু ২০ বছরেও নিউইয়র্কের আকাশে আর নিয়মিত যাত্রীবাহী বিমান নিয়ে ফিরতে পারেনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।
সর্বশেষ আবারও আশার কথা শুনিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ আগস্ট সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) অডিটে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মান অর্জন করতে পারলে আগামী বছর ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনায় ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। 
কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে এই বক্তব্য আরও আশাবাদীভাবে প্রকাশিত হয়েছে- ‘জানুয়ারি থেকেই ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট’। কিন্তু বাস্তব তথ্য বলছে, বিষয়টি এত সহজ নয়।
সর্বশেষ আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন উঠছে মূলত সরকারেরই আগের বক্তব্যের কারণে। মাত্র দুই মাস আগে, ২১ জুন তৎকালীন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছিলেন, নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ পেতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে এবং সে কারণে ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট দ্রুত চালুর বাস্তব সম্ভাবনা নেই। একই সময় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (ক্যাব) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, ২০২৮ সালের আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ক্যাব চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে প্রথমে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সেফটি অডিটের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হবে। ২০২৬ সালের অক্টোবরে আইকাওর একটি নিরাপত্তা অডিট হওয়ার কথা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ সেফটি অডিট নির্ধারিত রয়েছে ২০২৭ সালের অক্টোবরে। এরপরও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের এয়ারলাইন্সের নতুন করে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা অর্জন।  ফলে আগস্টে ‘আগামী জানুয়ারি’ নিয়ে নতুন আশাবাদের সঙ্গে জুনে দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেওয়া সময়সীমার একটি স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। এখানেই ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাটি সামনে আসে।
আইকাওর অডিটে ভালো ফল অবশ্যই বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু আইকাও অডিটে ভালো ফল করলেই বিমান বাংলাদেশ আগামী দিন থেকে নিউইয়র্কে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে—বিষয়টি এমন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ এখনও ক্যাটাগরি-২ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত। এফএএর ভাষায়, ক্যাটাগরি-২ অর্থ সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থা আইকাওর নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মান পুরোপুরি পূরণ করছে না। ক্যাটাগরি-১ অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বা সম্প্রসারিত অপারেশন নিয়ে বিধিনিষেধ থাকে। 
অর্থাৎ নিউইয়র্ক ফ্লাইটের জন্য শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা একটি নতুন উড়োজাহাজই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপত্তা তদারকি ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, এফএএ অনুমোদন, উপযুক্ত উড়োজাহাজ, রুট পরিকল্পনা এবং বাণিজ্যিকভাবে টেকসই অপারেশন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিউইয়র্কে যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৩ সালে। বিভিন্ন সময়ে দিল্লি, দুবাই, আমস্টারডাম, ব্রাসেলস ও ম্যানচেস্টার হয়ে নিউইয়র্কে যাতায়াত করেছে বিমান। কিন্তু অব্যাহত লোকসান, পুরোনো ডিসি-১০ উড়োজাহাজ, কারিগরি সমস্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক বাধার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।
অবশেষে ২০০৬  সালের ২৯ জুলাই নিউইয়র্কের উদ্দেশে শেষ ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান। তখন প্রতিটি নিউইয়র্ক ফ্লাইটে বিমানের প্রায় ৫২ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছিল। শেষ ফ্লাইটের সময়ও নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে রুট বন্ধ না করার দাবি উঠেছিল। সেই হিসেবে প্রায় দুই দশক ধরে নিউইয়র্কে নেই বিমানের নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট। রুট বন্ধ হওয়ার পর থেকেই সেটি পুনরায় চালুর ঘোষণা কম আসেনি। ২০০৮ সালেই বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল নিউইয়র্ক রুট পুনরায় চালুর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটনে যাওয়ার কথাও জানিয়েছিল। 
পরবর্তী বছরগুলোতেও কখনো নতুন উড়োজাহাজ কেনা, কখনো লিজ নেওয়া, কখনো এফএএর অনুমোদন, কখনো নিরাপত্তা মান উন্নয়নের কথা বলে নিউইয়র্ক রুট চালুর সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু নিউইয়র্কে বিমানের কাউন্টার আর খোলেনি।
প্রবাসীদের ভাষায়, বছর বদলায়, সরকার বদলায়- শুধু প্রতিশ্রুতির তারিখটাই সামনে এগিয়ে যায়। নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কাছে ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট কেবল যাতায়াতের একটি রুট নয়। এটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ, জাতীয় পরিচয় এবং স্বাচ্ছন্দ্যের প্রত্যাশা।
বয়স্ক বাবা-মা নিউইয়র্ক থেকে দেশে যাবেন, মাঝপথে বিমান বদলের ঝামেলা থাকবে না; ছোট সন্তান নিয়ে পরিবার দেশে যাবে, দীর্ঘ ট্রানজিটের ধকল কমবে; বাংলায় কথা বলা ক্রু, বাংলাদেশি খাবার এবং পরিচিত পরিবেশে বসেই যাত্রা শুরু হবে নিজের দেশের উদ্দেশে।
প্রবাসীদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বিশ্বের অন্যতম বড় বাংলাদেশি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর শহর নিউইয়র্কে বাংলাদেশের নিজস্ব বিমান সংযোগ থাকা শুধু ব্যবসার হিসাব নয়, মর্যাদারও বিষয়।
২০০৬ সালে রুট বন্ধের সময়ও একই আবেগ দেখা গিয়েছিল। নিউইয়র্কের প্রবাসীরা তখন বাংলাদেশ সরকারের কাছে রুটটি সচল রাখার অনুরোধ করেছিলেন। দুই দশক পরও প্রবাসীদের দাবি প্রায় একই।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী যাত্রীদের বড় অংশকে মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক কিংবা ইউরোপের কোনো হাব ব্যবহার করে যেতে হয়। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস, টার্কিশ এয়ারলাইন্সসহ বিভিন্ন বিদেশি এয়ারলাইন্সের ব্যবসার বড় অংশই তৈরি হয়েছে বাংলাদেশি যাত্রীদের ঘিরে।
প্রবাসীদের প্রশ্ন তাই সরল- বাংলাদেশ থেকে এত বড় যাত্রীবাজার থাকার পরও জাতীয় পতাকাবাহী বিমান কেন নিউইয়র্কে ফিরতে পারছে না?
বাস্তবতা হলো, যাত্রী থাকাই একটি রুট সফল হওয়ার একমাত্র শর্ত নয়। উড়োজাহাজের ব্যবহার, জ্বালানি ব্যয়, ক্রু, স্লট, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, রুট অধিকার, কানেক্টিং যাত্রী এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অনুমোদন- সবকিছু মিলিয়ে একটি দীর্ঘপাল্লার রুটের অর্থনীতি নির্ধারিত হয়।
২০০৬ সালে পর্যাপ্ত যাত্রী থাকার পরও বিশাল লোকসানের কারণেই শেষ পর্যন্ত রুটটি বন্ধ হয়েছিল।  ফলে এবারও শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসায়িক ও নিয়ন্ত্রক পরিকল্পনা। অক্টোবরে আইকাও নিরাপত্তা অডিটের ফল ভালো হলেও ২০২৭ সালের পূর্ণাঙ্গ সেফটি অডিট এবং এফএএর ক্যাটাগরি-১ প্রক্রিয়া বাকি থাকলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সের নিজস্ব উড়োজাহাজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন নিয়মিত ফ্লাইট শুরু করা কতটা সম্ভব, সে বিষয়ে সরকার এখনো বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রকাশ করেনি। 
কোন উড়োজাহাজে ফ্লাইট হবে, সপ্তাহে কয়টি ফ্লাইট হবে, নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় স্লট ও অনুমোদনের অবস্থা কী, এফএএ ক্যাটাগরি-১ অর্জনের সময়সীমা কত, এবং রুটটি আর্থিকভাবে কীভাবে টেকসই করা হবে, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরও এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
সুতরাং প্রবাসীরা আশাবাদী হতে চান। কিন্তু প্রায় ২০ বছরের অভিজ্ঞতা তাদের সতর্কও করেছে।
ঢাকা-নিউইয়র্ক রুট বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশে একাধিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। বিমানের বহরে আধুনিক বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এসেছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নির্মিত হয়েছে নতুন টার্মিনাল। তবুও নিউইয়র্কের সঙ্গে বিমানের সেই সম্পর্কটি আর ফিরল না।
এখন আবার বলা হচ্ছে- নিউইয়র্ক ফ্লাইট আসছে। হয়তো এবার সত্যিই আসবে। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিরাও সেটিই চান। কিন্তু দুই দশক ধরে একই স্বপ্ন দেখার পর তারা এখন আর শুধু ঘোষণা শুনতে চান না। তারা দেখতে চান এফএএ ক্যাটাগরি-১ অর্জনের বাস্তব অগ্রগতি, দেখতে চান উড়োজাহাজ প্রস্তুত, অনুমোদন সম্পন্ন, জেএফকেতে স্লট নিশ্চিত এবং টিকিট বিক্রির তারিখ ঘোষণা হয়েছে।
তারপর একদিন সত্যিই যদি নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা আঁকা বিমানটি ঢাকার উদ্দেশে উড়ে যায়—সেদিনই হয়তো শেষ হবে এই দুই দশকের অপেক্ষা।
ঢাকা-নিউইয়র্ক রুটে বিমান চালুর প্রতিশ্রুতি প্রবাসীদের কাছে আশার খবর যতটা, তার চেয়ে বেশি আরেকটি পুরোনো প্রশ্ন: এবার কি সত্যিই হবে, নাকি এটিও শুধুই আরেকটি আষাঢ়ে গল্প?
সূত্র: ঠিকানা