জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান

সহিংসতা সমস্যার সমাধান করে না, কেবল পিছিয়ে দেয়

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২৩

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান কূটনীতিক খলিলুর রহমান। দায়িত্ব নিয়েই তিনি তাঁর এক বছরের সভাপতিত্বকে বেঁধে দিয়েছেন একটিমাত্র লক্ষ্যের সঙ্গে—হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা।
কোনো রাখঢাক না রেখেই তিনি স্বীকার করছেন, যে প্রতিষ্ঠানে তিনি নানা পরিচয়ে ৩৫ বছর কাজ করেছেন, সেই জাতিসংঘ আজ এক ‘আস্থার সংকটের’ ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। হাই-লেভেল উইক শুরু হওয়ার প্রাক্কালে জাতিসংঘ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন সংস্থার ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রূপান্তর’, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি এবং রোহিঙ্গা সংকটে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা নিয়ে।
খলিলুর রহমান ফিরে গেলেন ১৯৪৫ সালে। ইয়াল্টায় রুজভেল্ট, স্তালিন ও চার্চিল আট দিনের বৈঠকে যুদ্ধ অবসানের পাশাপাশি যে বিশ্ব সংস্থার কথা ভেবেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই—দুই বিশ্বযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। সান ফ্রান্সিসকোতে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মুহূর্তে প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দিয়েছিলেন। সেই করতালির ভেতরে ছিল একটি প্রত্যাশা—জাতিসংঘ শান্তি এনে দিতে পারবে।
আট দশক পরের হিসাব মেলাতে গিয়ে তিনি বলেন, বড় ধরনের বৈশ্বিক মহাযুদ্ধ এড়ানো গেছে, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত দেশগুলো জাতিসংঘের ভেতরে একটি শক্তিশালী উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তুলতে পেরেছে। কিন্তু একই সঙ্গে বহু সংঘাত ঠেকানো যায়নি, উন্নয়নের গতি বহু ক্ষেত্রেই থেকেছে শ্লথ।
‘দুই স্তম্ভেই বিপুল অপূর্ণ প্রত্যাশা জমে আছে, আর সেটাই হতাশা তৈরি করছে,’ বলেন তিনি। এই হতাশা থেকেই মানুষের মনে ধারণা জন্মেছে যে জাতিসংঘ তার কাছে প্রত্যাশিত কাজটি করছে না—এবং সেখান থেকেই আস্থার পতন। মানবাধিকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি একটি সংখ্যা উল্লেখ করেন, যা নিজেই একটি মন্তব্য—জাতিসংঘের তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এই খাতে মোট ব্যয়ের মাত্র চার শতাংশ খরচ হয়।
খলিলুর রহমান মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদকে আরও সংহতভাবে কাজ করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠার সময় যা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা সরবরাহ করতে হবে। তিন স্তম্ভেই একযোগে কাজ না করলে জন্মলগ্নের সেই আস্থা ফেরানো সম্ভব নয় বলে তাঁর অভিমত।
বিশ্ব বদলে গেছে—এই কথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে খলিলুর রহমান সামনে আনলেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে।
তাঁর ভাষায়, এআই হতে পারে মানব প্রচেষ্টার এক বিরাট সাফল্য। আবার বিশ্বের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির উদ্বেগ যদি সত্য হয়, তবে এটি মানবজাতির জন্য গুরুতর বিপদও ডেকে আনতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, উদ্ভাবনের গতি থামানোর পক্ষে তিনি নন। কিন্তু প্রয়োজন যথাযথ ‘গার্ডরেল’—যাতে এই উদ্ভাবন মানুষের বিরুদ্ধে না গিয়ে মানুষের সেবায় লাগে। আর এই দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়; যাঁরা এই প্রযুক্তি তৈরি ও ব্যবহার করছেন, তাঁদের সবাইকে আলোচনার টেবিলে থাকতে হবে।
সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের নৈতিক ওজন আছে, কিন্তু দাঁত নেই—সমালোচকদের এই অভিযোগের জবাবে সভাপতির যুক্তি সরল। পরিষদ যদি অকেজোই হতো, তবে হাই-লেভেল উইক বলে কিছু থাকত না, রাষ্ট্রপ্রধানেরাও আসতেন না। তিনি মনে করিয়ে দেন, কূটনীতি সব সময় প্রকাশ্যে হয় না। সাধারণ পরিষদ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের একটি নিরাপদ পরিসর দেয়, যেখানে তাঁরা কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে একসঙ্গে বসতে পারেন। গোটা পৃথিবীর প্রতিনিধিত্ব করা এমন আরেকটি মঞ্চ পৃথিবীতে নেই বলেই তাঁর বিশ্বাস।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে ভারী অংশটি ছিল রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ। খলিলুর রহমান এই সংকটে সরাসরি কাজ করেছেন।
একটি জনগোষ্ঠীকে আক্রমণ করা হয়েছে, ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে, গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নিজ দেশের মানুষই তাড়িয়ে দিয়েছে তাদের—এই নৃশংসতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি যে বিবরণ দিয়েছেন, তা উচ্চারণ করাও কঠিন। একই সঙ্গে তিনি দেখেছেন তাদের অদম্য টিকে থাকার শক্তি আর ঘরে ফেরার আকুতি। জাতিসংঘ মহাসচিব গত বছর কক্সবাজার সফরে গেলে রমজানের এক সন্ধ্যায় এক লাখেরও বেশি শরণার্থী তাঁর সঙ্গে ইফতারে জড়ো হয়েছিলেন। প্রত্যেকের হাতে ছিল একটি করে প্ল্যাকার্ড, তাতে লেখা—আমরা ঘরে ফিরতে চাই।
‘যে শিক্ষা আমি বহন করছি তা হলো, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান করে না। এটি কেবল সমস্যাটিকে পিছিয়ে দেয়, আরও জটিল করে তোলে,’ বলেন খলিলুর রহমান। আলোচনা ও সমঝোতার পথেই—একসঙ্গে বসেই—সমাধান সম্ভব।
সভাপতিত্বের শেষ দিনটির কথা ভেবে তিনি কী নিয়ে গর্ব করতে চান? এর জবাব খলিলুর রহমান জানালেন, নিজের কর্মসহযোগীদের তিনি সেদিনই বলেছেন—তিনি আজকের দিকে তাকিয়ে নেই, তাকিয়ে আছেন সেই দিনটির দিকে, যেদিন উত্তরসূরির হাতে গ্যাভেল তুলে দেবেন।
সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে যদি সংস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কারে একমত করা যায়, আর্থিকভাবে সচল রাখার বিষয়ে সম্মত করা যায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেবা পৌঁছানোর গতি বাড়ানো যায়—এর যেকোনো একটিতেও যদি অগ্রগতি হয়, তবে খুশি মনেই তিনি গ্যাভেলটি হস্তান্তর করবেন।
চার দশকেরও বেশি আগে বাংলাদেশের আরেকটি সাধারণ পরিষদ-সভাপতিত্বের সময় তিনি নিজ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই একই আসনে বসে এবার নিজেই সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদশের খলিলুর রহমান।