
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগদান করতে নিউইয়র্ক আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নয় দিনের এক সফরে ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক পৌছবেন তিনি।
সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিবেন ২৪ সেপ্টেম্বর। ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোর উদ্দেশ্যে ২৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ত্যাগ করবেন এবং সেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্বনেতাদের অংশ গ্রহণে উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিবেন প্রধানমন্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কয়েকজন বিশ্ব নেতার সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে তারেক রহমানের। এছাড়া এবারের অধিবেশন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ চার দশক পর বাংলাদেশের সভাপতিত্বে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তারেক রহমানের ভাষণ বাংলাদেশকে পৌঁছে দিবে ভিন্ন উচ্চতায়।
প্রধানমন্ত্রীর নাগরিক সংবর্ধনা
সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে নেতৃত্বকারী বাংলাদেশের সরকার প্রধানদেরকে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদানের রেওয়াজ চালু আছে নিউইয়র্কে। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানে অনুষ্ঠেয় নাগরিক সংবর্ধনা নিয়ে বাংলাদেশি আমেরিকানদের মাঝে চলছে ব্যাপক আলোচনা। দীর্ঘ ২১ বছর পর মা খালেদা জিয়ার পর সম্মানিত হবেন তারেক রহমান। স্থানীয় বাংলাদেশি মিডিয়ার সাথেও বিভিন্ন সময় মিলিত হন দেশের সরকার প্রধানগণ।
চলতি বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউইয়র্কে মিডিয়ার মুখোমুখি হবেন না বলে নিশ্চিত করেছে বিশ্বস্থ সূত্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগদানের ইচ্ছে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এজন্য ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলের দিকটা বেছে নেয়া হয়েছে প্রাথমিকভাবে। নিউইয়র্ক বাংলাদেশ কনসূলেট জেনারেলকে এব্যাপারে কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশও দেয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। তবে তা থমকে গেছে।
উল্লেখ্য গত বছর অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করেন।
এসময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে মিলিত হন তিনি। ম্যানহাটান ম্যারিয়ট মার্কিস হোটেলে এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন সাত শতাধিক আমন্ত্রিত বাংলাদেশি। নিউইয়র্ক কনসূলেট তত্ত্বাবধান করে পুরো অনুষ্ঠানটি। এতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ডলার ব্যয় হয় বলে জানা গেছে কনসূলেট সূত্রে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবর্ধনায় এবার এক হাজার প্রবাসীর অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলারের একটি বাজেট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে নিউইয়র্ক কনসূলেট। বাংলাদেশি টাকায় যা তিন কোটিরও অধিক। মোটা অংকের এই অর্থ ব্যয় করে অনুষ্ঠান না করার পক্ষে ইতোমধ্যেই মত দিয়েছেন তারেক রহমান। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতৃবৃন্দ দাবি জানিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনার আয়োজক হওয়ার।
এজন্য দলটির একজন শীর্ষ নেতা ঢাকা গিয়ে বিষয়টি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। তবে দলীয় ব্যানারে তারেক রহমান সংবর্ধনায় অংশ নিবেন কিনা এ বিষয়টি স্পষ্ট করেননি কেউই। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কোন কমিটি নেই ২০১১ সালের পর থেকে। নেতৃবৃন্দের ঐক্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে অর্থের সংকুলান কিভাবে হবে তা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি তারপরও দায়িত্ব গ্রহণে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে। ম্যানহাটান ম্যারিয়ট মার্কিস হোটেল বুকিং দেয়া হয়েছে বলেও জানান দায়িত্বশীল একজন বিএনপি নেতা। সংবর্ধনার ব্যয়ভারও বহন করতে চান বিএনপির নেতাকর্মীরা।
রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় সংকোচন নীতিতে অটল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি অনুশীলনীয় হয়ে উঠছেন কৃচ্ছ্বতা সাধনে। আওয়ামী শাসনামলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেকর্ড সংখ্যক মোট ১৭বার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে নেতৃত্ব দেন। প্রতিবারই প্রায় দু’শতাধিক সঙ্গী নিয়ে এই সফরকে তিনি পরিণত করেন আনন্দ ভ্রমণে। শেখ হাসিনার অবস্থানকারী হোটেল লবি তখন পরিণত হতো আওয়ামী হাটে। দেশের কয়েক ডজন অর্থ ও ব্যাংক লুটেরা তার সেসব লটবহরে যোগান দিতেন অর্থের। স্থানীয় আওয়ামী লীগের আয়োজনে কার্যত নাগরিক সংবর্ধনায় সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশীরা বরাবরই ছিলেন অনাহুত।
কিন্তু ব্যতিক্রমী তারেক রহমান এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। এবার তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর সঙ্গী হচ্ছেন সীমিত সংখ্যক ব্যক্তি। নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ সর্বসাকুল্যে ৪০জন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এবারই তার প্রথম সফর। সর্বশেষ তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন ২০০৫ সালে। তখন তার সফরসঙ্গী ছিলেন তৎকালীন বিএনপি সরকারের জ্বালানী উপদেষ্টা বর্তমান দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রয়াত মেজর জেনারেল রেজাকুল হায়দার চৌধুরী। সেসময় তিনি ম্যানহাটানের একটি হোটেলে স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দের সাথে মিলিত হন।
জাতিসংঘে বিএনপি নেতৃত্ব :
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট ঐতিহাসিক ভাষণ দেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে। ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে বৈষম্য হ্রাস ও পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণে তার প্রস্তাব প্রশংসা পায় বিশ্ব দরবারে। খালেদা জিয়া দুই মেয়াদে ১০ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদকালে ১৯৯৩ সালে সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে এবং দ্বিতীয় মেয়াদকাল ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ২০০২ এবং ২০০৫ সালে সাধারণ পরিষদের ৫৭ ও ৬০তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার শাসনামলে বাকী তিন বছর সাধারণ পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোর্শেদ খান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমান।
বিএনপি সরকারের শেষ মেয়াদে ২০০২ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের শিশুবিষয়ক বিশেষ অধিবেশনে যোগদান করেন ও ভাষণ দেন। খালেদা জিয়া ২০০৫ সালের সাধারণ পরিষদ অধিবেশনেও ভাষণ দেন। এই সফর ছিল তার প্রধানমন্ত্রীত্বের শেষ সফর। বেগম খালেদা জিয়াকে ২০০২ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা নাগরিক সংবর্ধনা দেন ম্যানহাটানের হিলটন হোটেলে। তখনকার সময়ে হোটেল হিলটনে মোট ব্যয় হয় ৪০হাজার ডলার। অপরদিকে ২০০৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ম্যানহাটানের হোটেল গ্র্যান্ড হায়াতে গণসংবর্ধনার আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও প্রবাসী বাংলাদেশীরা। এবার তারেক রহমানকে দেখতে এবং তার কথা শুনতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকে। সংবর্ধনার জন্য প্রস্তাবিত হোটেলের আসন সংখ্যা সীমিত। এখানে সংবর্ধনার আয়োজন করলে বিবেচনায় রাখতে হবে এ বিষয়টিও।
হাসিনার সংবর্ধনা বাতিক—
ক্ষমতাচ্যুতির পূর্বে শেখ হাসিনা ২০২৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনে যোগ দেন। সেবারও ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের ম্যারিয়ট মার্কিস হোটেলে নাগরিক সংবর্ধনার নামে নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজন করে দলীয় সমাবেশ। শেখ হাসিনা যতবার জাতিসংঘে এসেছেন ততবারই বহুধা বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন দলীয়ভাবে সংবর্ধনা দেন তাকে। এর আগে শেখ হাসিনা সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে যোগদান করতে নিউইয়র্কে এসেছিলেন। এসময় তিনি প্রতিনিধি দল ও তার পরিবারের সকল সদস্য সমেত দশদিন অবস্থান করেন ম্যানহাটানের হোটেল গ্র্যান্ড হায়াতে। ভাষণ দেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ প্রদত্ত সংবর্ধনায়। নিউইয়র্কে সংবর্ধনার বিষয়টি হাসিনার এক ধরনের বাতিকে পরিণত হয়। যদিও বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের আইনে বা আরপিওতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বর্হিবিশ্বে দেশের রাজনৈতিক দলের শাখা কমিটি গঠনে। কিন্তু তিনি এসবের তোয়াক্কা করেননি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে নিউইয়র্ক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি অংশ নিবেন। এ নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনার ঘাটতি নেই তাদের মাঝে। প্রবাসীদের দাবি এবারের অনুষ্ঠান বিলাসী নয় বরং ব্যয় কমিয়ে বৃহত্তর একটি স্থানে সর্বজনীন সংবর্ধনার আয়োজন করা হোক, যেখানে কয়েক হাজার প্রবাসী যাতে অংশ নিতে পারেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি আমন্ত্রণ নিয়েও রয়েছে একটি বড় সমস্যা। বিদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দলমতের উর্ধ্বে দেখতে চান প্রবাসী বাংলাদেশিরা।