মামদানির ২২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবের সমালোচনা

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১০ জুন ২০২৬, ১৫:৫৬

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি শহরের আবাসন সংকট সমাধানের লক্ষ্যে সম্প্রতি ‘ব্লক বাই ব্লক: দ্য হাউজিং প্ল্যান ফর আ নিউ এরা’ নামক একটি নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই পরিকল্পনায় আগামী এক দশকে ২ লাখ সাশ্রয়ী ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত বাড়ি নির্মাণ এবং ২ লাখ বিদ্যমান ইউনিট সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এর পেছনে করদাতাদের অর্থ থেকে আগামী ৫ বছরে ২২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। মেয়রের এই পরিকল্পনাকে অনেকেই উচ্চাভিলাষী ও ব্যয়বহুল মনে করছেন। ফক্স নিউজের কলাম গবেষক নিকোল হুয়ার ও অ্যানি হেইম এই পরিকল্পনাকে একটি ‘ব্যর্থ সমাজতান্ত্রিক নীতি’ এবং ‘অবাস্তব প্রস্তাব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সমালোচকদের মতে, আবাসন সংকটের মূল কারণ কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টিকারী কিছু কেন্দ্রীয় নীতি এবং সরবরাহের ঘাটতি। নিউইয়র্কের মতো ডেমোক্র্যাট-প্রধান শহরগুলোতে উচ্চ কর, কঠিন নিয়মকানুন ও ভাড়া-নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, সরকারি হস্তক্ষেপ বন্ধ করে এবং নিয়ম সহজ করে নতুন আবাসন নির্মাণ বাড়ানোই এর একমাত্র সমাধান; কিন্তু মামদানির পরিকল্পনা এর ঠিক উল্টো। মুক্তবাজার নয়, বরং মেয়রের সমাজতান্ত্রিক ধারার ‘রেন্ট গাইডলাইনস বোর্ড’ নির্ধারণ করবে বাড়িওয়ালারা কত ভাড়া নেবেন। আগামী ২৫ জুন এর চূড়ান্ত ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এই সরকারি হস্তক্ষেপের ফলে বাজারে ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমবে, ভাড়া বাড়বে এবং আবাসনের মান কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মেয়র মামদানির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অবহেলিত বা জীর্ণ ভবনের মালিকানা ব্যক্তিগত বাড়িওয়ালাদের হাত থেকে নিয়ে কমিউনিটি ল্যান্ড ট্রাস্ট, অলাভজনক সংস্থা বা ভাড়াটেদের নিজেদের হাতে হস্তান্তর করা হবে। এর মাধ্যমে নগর কর্মকর্তারা জীর্ণ ভবনগুলো উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি হতে না দিয়ে সরকার-অনুমোদিত ক্রেতাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ‘কমিউনিটি অপরচুনিটি টু পারচেজ অ্যাক্ট (২০২৫)’ এর আওতায় অলাভজনক সংস্থা ও ভাড়াটে গোষ্ঠীগুলোকে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন কেনার ক্ষেত্রে ‘অগ্রাধিকারমূলক অধিকার’ দেওয়া হয়েছে। ফলে, অবহেলিত এই ভবনগুলো আর উন্মুক্ত বাজারে বিক্রি হতে পারছে না, যেখানে যেকোনো সাধারণ ক্রেতা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারতেন।
অথচ ‘নিউইয়র্ক সিটি হাউজিং অথরিটি’ ইতিমধ্যেই দেশের বৃহত্তম সরকারি আবাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করছে, যেখানে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার অ্যাপার্টমেন্টে ৫ লাখের বেশি মানুষ বাস করেন। সমালোচকদের মতে, যেখানে অতিরিক্ত সরকারি হস্তক্ষেপই আবাসন সংকটকে আরও খারাপ করেছে, সেখানে দক্ষ ব্যক্তিগত ডেভেলপার ও বিনিয়োগকারীদের হাত থেকে আরও সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে সরকারের পছন্দের অদক্ষ প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়ার মামদানির এই যুক্তিটি সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গবেষকেরা এটিকে কার্ল মার্ক্সের ‘উৎপাদনের উপায় দখল ও পুনর্বণ্টন’ অর্থাৎ কমিউনিস্ট কায়দায় ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রেন্ট গাইডলাইনস বোর্ড প্রায় ১০ লাখ ভাড়ার ইউনিটের ওপর মূল্যের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয়, যা মালিকদের মুনাফা অর্জনের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। মুনাফার সুযোগ না থাকায় মালিকেরা যখন বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন না, তখন মামদানি ‘রেন্টাল রিপঅফ হিয়ারিংস’-এর মতো ফোরাম ব্যবহার করে তাঁদের তীব্র সমালোচনা করেন। এই প্ল্যাটফর্মটি ভাড়াটেদের খারাপ অভিজ্ঞতার কথা বলার সুযোগ দেয়। নিকোল হুয়ার ও অ্যানি হেইম মনে করেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো ‘অবহেলনাকারী’ মালিকদের সরিয়ে দেওয়া এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা—যা মূলত সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার পেছনে একটি চিরচেনা কমিউনিস্ট অজুহাত। আপাতদৃষ্টিতে ভাড়া-নিয়ন্ত্রণ নীতিকে ভাড়াটেদের জন্য উপকারী মনে করা হলেও বাস্তবে এই সমাজতান্ত্রিক নীতি আবাসনের সরবরাহ কমিয়ে দেয়, নিয়ন্ত্রণহীন সাধারণ ফ্ল্যাটগুলোর ভাড়া বাড়িয়ে দেয় এবং ভবনের মান দিন দিন খারাপ করতে বাধ্য করে।
মুনাফার সম্ভাবনা কম বা শূন্য হওয়ায় নতুন নির্মাতারা ভাড়া-নিয়ন্ত্রণ নীতি থাকা এলাকায় আবাসন নির্মাণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। একই সঙ্গে বাড়িওয়ালারাও ফ্ল্যাট সংস্কার বা মান বজায় রাখার পেছনে খরচ করতে চান না। ‘ন্যাশনাল মাল্টিফ্যামিলি হাউজিং কাউন্সিল’ এর হিসাব অনুযায়ী, এই ভাড়া-নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে নিউইয়র্ক সিটির সাধারণ (নিয়ন্ত্রণহীন) ফ্ল্যাটগুলোর ভাড়া প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। নিয়ন্ত্রণমুক্ত বাজার বা অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার মতো সরবরাহ-ভিত্তিক ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোই আবাসনের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারে। অথচ মামদানির ‘ব্লক বাই ব্লক’ পরিকল্পনাটি সেই সব বিনিয়োগকারী এবং ডেভেলপারদের বিরুদ্ধে কাজ করছে, যারা মূলত আবাসন সংকটের প্রকৃত সমাধান করতে পারতেন।
সমালোচকদের মতে, মামদানির ‘ব্লক বাই ব্লক’ পরিকল্পনাটি আবাসন সম্পত্তিগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত ক্রেতাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, ভাড়া ফ্রিজ বা সীমিত করছে এবং আরও বেশি ভাড়া-নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে শত কোটি ডলার অপচয় করছে। এটি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত পুঁজি ও বিনিয়োগকারীদের কাছে এই স্পষ্ট বার্তাই পাঠাচ্ছে যে, ‘বিগ অ্যাপল’ ব্যবসার জন্য আর উপযুক্ত স্থান নয়।
তারা মনে করেন, নিউইয়র্ক সিটি যদি আবাসন খাত থেকে সরকারি হস্তক্ষেপ সরিয়ে নিয়ে মুক্তবাজারকে কাজ করার সুযোগ দেয়, তবে করদাতাদের শত কোটি (বিলিয়ন) ডলার, সময় এবং শ্রম বেঁচে যাবে। শহর কর্তৃপক্ষ যদি শুরুতেই আবাসন নির্মাণকে ধীর ও ব্যয়বহুল করে তোলা নিয়মকানুনের বেড়াজাল এবং ভাড়া-নিয়ন্ত্রণ নীতিগুলো দূর করে দেয়, তবে ডেভেলপাররাই করদাতাদের ২২ বিলিয়ন ডলারের বোঝা ছাড়াই নতুন আবাসন ইউনিট তৈরি করতে পারবে।