
যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন সংকট ক্রমেই রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে নিউইয়র্কের মতো ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত ‘ব্লু স্টেট’-গুলোর জন্য এই সংকট ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশজুড়ে জনসংখ্যা প্রবণতার কারণে আগামী জাতীয় জনগণনার পর নিউইয়র্ক রাজ্য দুইটি কংগ্রেস আসন হারাতে পারে। এর ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজ্যটির ইলেক্টোরাল ভোটও কমে যাবে।
গবেষণা অনুযায়ী, একই ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া ও ইলিনয়সও। বিপরীতে, ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-সমর্থিত ‘রেড স্টেট’-গুলো জনসংখ্যা বাড়ার কারণে কংগ্রেসে আসন এবং ইলেক্টোরাল ভোট—দুটোই বাড়াতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ফ্লোরিডা ও টেক্সাস প্রত্যেকটি চারটি করে নতুন কংগ্রেস আসন পেতে পারে।
আবাসন নির্মাণে বৈষম্য
বিশ্লেষকদের মতে, এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ হলো আবাসন নির্মাণের অসম গতি। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে ১৭ লাখের বেশি নতুন ঘরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অথচ একই সময়ে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ইলিনয়স—এই তিন রাজ্যে মোট মিলিয়ে অনুমোদন পেয়েছে সাত লাখেরও কম ঘর, যদিও এই তিন রাজ্যের সম্মিলিত জনসংখ্যা ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের তুলনায় প্রায় দেড় কোটি বেশি।
থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পাবলিক এন্টারপ্রাইজের পরিচালক পল উইলিয়ামসের ভাষায়, ফ্লোরিডা ও টেক্সাসে এমন আইন রয়েছে, যা আবাসন নির্মাণকে সহজ ও উৎসাহিত করে। নিউইয়র্কে সেই কাঠামো তুলনামূলকভাবে অনেক কঠোর।
নিউইয়র্ক ছাড়ছেন মধ্যবিত্তরা
ফিস্কাল পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, নিউইয়র্কে আবাসনের উচ্চমূল্য মধ্যবিত্তদের রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করছে। কম করের রাজ্য ফ্লোরিডায় গিয়ে তারা কর সাশ্রয়ের চেয়েও বেশি লাভ করছে ভাড়া ও মর্টগেজ খরচ কমে যাওয়ার কারণে। এতে নিউইয়র্কের কর্মক্ষম ও ভোটার জনসংখ্যা কমছে, যা সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে প্রভাব ফেলছে।
প্রো-হাউজিং সংগঠন ওপেন নিউইয়র্কের নির্বাহী পরিচালক অ্যানমেরি গ্রে বলেন, “মানুষের নিউইয়র্কে থাকা সম্ভব ও সাশ্রয়ী না হলে, সেটি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অস্তিত্বের জন্যই হুমকি।”
জোনিং আইন বড় বাধা
নিউইয়র্কে আবাসন সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় জোনিং আইন। অনেক শহর ও টাউনে এই আইন নতুন আবাসন নির্মাণকে কঠোরভাবে সীমিত করে, কোথাও কোথাও একেবারেই নিষিদ্ধ করে দেয়। আইনপ্রণেতারা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার এখনো দৃশ্যমান নয়।
স্টেট অ্যাসেম্বলির হাউজিং কমিটির চেয়ার লিন্ডা রোজেনথাল বলেন, সবাই সমস্যার কথা স্বীকার করে, কিন্তু কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ সেখানেই থেমে যায়।
গভর্নর-মেয়রের উদ্যোগ
এই প্রেক্ষাপটে গভর্নর ক্যাথি হোচুল রাজ্যজুড়ে আবাসন বাড়াতে পরিবেশগত পর্যালোচনা আইন শিথিল করার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, ছোট ও মাঝারি আকারের আবাসন প্রকল্পগুলো দীর্ঘ পরিবেশগত পর্যালোচনার প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত অনুমোদন পেতে পারে। তবে পরিবেশ সুরক্ষার মূল বিধান বহাল থাকবে।
এক অনুষ্ঠানে হোচুল বলেন, যখন কোনো কমিউনিটি নির্মাণে সম্মতি দেয়, তখন রাজ্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, আবাসন নির্মাণে গতি আনা জরুরি।
শহর ও উপশহরের বৈপরীত্য
নিউইয়র্ক সিটির আশপাশের চারটি উপশহর—ন্যাসাউ, রকল্যান্ড, সাফোক ও ওয়েস্টচেস্টার—এই দশকে প্রতি এক হাজার বাসিন্দার জন্য গড়ে মাত্র পাঁচটি নতুন আবাসনের অনুমোদন দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসন নীতি অঞ্চলভিত্তিক না হয়ে শহরভিত্তিক হওয়ায় অনেক এলাকাই কার্যত ‘না-বলার গ্রাম’-এ পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউইয়র্ক যদি দ্রুত ও ব্যাপকভাবে আবাসন নির্মাণে গতি না আনে, তাহলে শুধু অর্থনৈতিক নয়—রাজনৈতিকভাবেও রাজ্যটি দুর্বল হয়ে পড়বে। কংগ্রেস আসন ও ইলেক্টোরাল ভোট হারানো মানে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব কমে যাওয়া, যার প্রভাব পড়বে আগামী কয়েক দশক ধরে।
এই বাস্তবতায় আবাসন সংকট এখন আর শুধু বসবাসের প্রশ্ন নয়—এটি নিউইয়র্কের রাজনৈতিক ভবিষ্যতেরও বড় নির্ধারক হয়ে উঠছে।