জেফ্রি এপস্টেইন কেলেঙ্কারির নীরব ভুক্তভোগীরা

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:১২

 জেফ্রি এপস্টেইন কেলেঙ্কারি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত যৌন অপরাধ মামলা। এপস্টেইন সংক্রান্ত নথিগুলো রাষ্ট্র, আইনব্যবস্থা এবং অভিজাত সমাজের গভীরে প্রোথিত মানব পাচারের একটি অস্বস্তিকর দলিল হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে যেভাবে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের নাবালিকা কিশোরীদের শোষণ করা হয়েছে। যেভাবে ধনী ও প্রভাবশালীরা প্রায় অদৃশ্য থেকেছে—তা এই বিষয়টিকে সাধারণ অপরাধের সীমা ছাড়িয়ে দিয়েছে।
২০১৯ সালে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী, জেফ্রি এপস্টেইনের অপরাধের কমপক্ষে ৪০ জন শনাক্ত ভুক্তভোগী ছিলেন। তাদের বেশিরভাগই ঘটনার সময় নাবালিকা। তবে এই সংখ্যা যে প্রকৃত চিত্র নয়, তা স্পষ্ট হয়ে যায় ২০২০ সালে গঠিত Epstein Victims’ Compensation Program –এর তথ্য থেকে। ওই কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১৩৫ জন নারী ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করেন। যা দেখায়—সরকারি চার্জশিটের বাইরেও বহু ভুক্তভোগী দীর্ঘদিন নীরবে ছিলেন।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন। এপস্টেইন প্রথমে আর্থিক সহায়তা, কাজের প্রলোভন বা ভ্রমণের সুযোগ দেখিয়ে কিশোরীদের নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতেন। এরপর তাদের ওপর চলত ধারাবাহিক যৌন নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, এই নারীদের একাংশকে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হতো—যেখানে ক্ষমতা, খ্যাতি এবং অর্থ তাদের নীরবতা নিশ্চিত করত।
এই নীরবতার দেয়াল ভাঙতে গিয়ে ভুক্তভোগীরা যে মানসিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন, তার পূর্ণ চিত্র আজও অজানা। ভুক্তভোগীদের মধ্যে কতজন আত্মহত্যা করেছেন বা রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন—এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এ নিয়ে নানা দাবি থাকলেও, সেগুলোর কোনোটিই আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা দ্বারা নিশ্চিত নয়।
এপস্টেইনের নিজের মৃত্যু মামলাটিকে আরও জটিল করে তোলে। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কে ডিটেইন অবস্থায়  তার মৃত্যু সরকারি তদন্তে আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত হলেও, নিরাপত্তা ব্যর্থতা ও অসঙ্গতির কারণে বিষয়টি আজও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যায় ফৌজদারি বিচার, আর থমকে যায় সেই প্রশ্ন—এপস্টেইন একা ছিলেন, নাকি তিনি একটি বৃহত্তর মানব পাচার নেটওয়ার্কের মুখ মাত্র?

সাম্প্রতিক সময়ে আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত দেওয়ানি মামলার নথিতে বহু পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন— নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। তবুও এই নথিগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয় যে মানব পাচার ও যৌন নিপীড়ন শুধু অন্ধকার গলিতে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তা ঘটে সমাজের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোয়, ধনীদের নিরাপদ বলয়ে।
আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নাকি অর্থ ও ক্ষমতা থাকলে বিচার এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব? এপস্টেইন কেলেঙ্কারি সেই প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। মানব পাচারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—অপরাধের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে নীরবতা।