ফিফা কি আর্জেন্টিনার প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছে? বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক ও পরিসংখ্যান

বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষণ
স্পোর্টস ডেস্ক
  ১০ জুলাই ২০২৬, ০১:০০

বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখতে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিচ্ছে আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের সেটা করতেও হতো। 
নকআউট পর্বের প্রথম দুই রাউন্ডে কেপ ভার্দে ও মিসরের বিরুদ্ধে আলবিসেলেস্তেরা অনায়াসে জয় পাবে—এমনটা আশা করা হলেও শেষ পর্যন্ত দুটি ম্যাচেই তাদের ৩-২ ব্যবধানে দাঁত কামড়ে লড়াই করে জিততে হয়েছে। 
তবে মিসরের বিরুদ্ধে জয়টি এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শেষ ষোলোর ম্যাচে দায়িত্ব পালন করা রেফারিদের টুর্নামেন্ট থেকে বহিষ্কার করার জন্য ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে আফ্রিকান দেশটি। 
মিসর সরাসরি অভিযোগ তুলেছে যে, রেফারির সিদ্ধান্তগুলো আর্জেন্টিনার পক্ষে ছিল এবং তাদের পোস্টারবয় লিওনেল মেসির প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব দেখানো হয়েছে। 
ম্যাচ শেষে মিসরের কোচ হোসাম হাসান ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, তাদের দলের প্রতি ‘অবিচার’ করা হয়েছে। ফিফার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘হয়তো তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি যেন টুর্নামেন্টে টিকে থাকে।’ 
আসলেই কি আর্জেন্টিনাকে জেতানোর জন্য সবকিছু আগে থেকে সাজানো হচ্ছে? এই ‘কনস্পিরেসি থিওরি’ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভেতরের সত্যতা এবং পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখা যাক। 

১. লাল কার্ড থেকে মেসির বেঁচে যাওয়া এবং ৫টি গোল
টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে আলজেরিয়ার অধিনায়ক ঈসা মান্দির ওপর লিওনেল মেসির একটি ফাউলের কথা মনে করা যাক। সেই বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য মেসিকে একটি হলুদ কার্ডও দেখানো হয়নি।
অথচ, বসনিয়ার বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের একটি ফাউলের কারণে ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারি) রিভিউ দেখে লাল কার্ড দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগানকে। মেসি ও বালোগান—উভয়ই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের পায়ের কাফে আঘাত করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন জানানোর সময় মেসির এই উদাহরণটিই সামনে এনেছিল। 
সেদিন মেসি লাল কার্ড পেলে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোল, এবং অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে করা জোড়া গোল আসত না—কারণ তিনি তখন নিষিদ্ধ থাকতেন। এমনকি জর্ডানের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচেও তিনি মাঠে নামতে পারতেন না, যে ম্যাচেও তিনি গোল করেছিলেন। অর্থাৎ, লাল কার্ড পেলে চলতি টুর্নামেন্টে তার করা ৮টি গোলের মধ্যে ৫টি গোলই হতো না। এটি কি মেসির প্রতি রেফারিদের ‘বিশেষ নমনীয়তা’ ছিল? 

২. আর্জেন্টিনাকে কি কম হলুদ কার্ড দেখানো হচ্ছে? 
কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচগুলোতে দলগুলোর সামনে কার্ডের বড় ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে টুর্নামেন্টের ১৭ জন খেলোয়াড় আর একটিমাত্র হলুদ কার্ড পেলেই সম্ভাব্য সেমিফাইনালে খেলা থেকে বঞ্চিত হবেন।
তবে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি একেবারেই কম। তাদের কেবল গঞ্জালো মন্তিয়েল কার্ডের ঝুঁকিতে আছেন। 
অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলের চারজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় (যার মধ্যে জুড বেলিংহাম ও ডেক্লান রাইস অন্যতম) কার্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন। নরওয়ের ক্ষেত্রে কেবল আন্তোনিও নুসা একটি হলুদ কার্ডের ওপর আছেন। 

কোন দল কতটা ফাউল করছে এবং তার বিপরীতে কয়টি কার্ড পাচ্ছে, সেই অনুপাত দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়:

  • আর্জেন্টিনা: প্রতি ১৯.৭টি ফাউলে ১টি হলুদ কার্ড পাচ্ছে।
  • ইংল্যান্ড: প্রতি ৭.৭টি ফাউলে ১টি হলুদ কার্ড পাচ্ছে।

চলতি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের চেয়ে আর্জেন্টিনা বেশি ফাউল করেছে, অথচ কার্ড পেয়েছে ইংল্যান্ডের অর্ধেক। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে, ফাউলের সংখ্যার তুলনায় আর্জেন্টিনার প্রতি রেফারিরা বেশ কিছুটা নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন। 

৩. আর্জেন্টিনার পেনাল্টির রেকর্ড 
২০২২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তখন তারা এক টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৫টি পেনাল্টি পাওয়ার নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল। 
২০২৬ বিশ্বকাপেও পেনাল্টি পাওয়ার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে আর্জেন্টিনা। চলতি আসরে তারা ইতোমধ্যেই ৩টি পেনাল্টি পেয়েছে (যদিও এর মধ্যে অস্ট্রিয়া ও মিসরের বিরুদ্ধে ২টি পেনাল্টি মিস করেছেন মেসি)। যেখানে ইংল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড পেয়েছে ২টি করে এবং বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও নরওয়ে পেয়েছে ১টি করে পেনাল্টি। 
পরিসংখ্যান এবং মাঠের কিছু সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে মিসর ও অন্যান্য প্রতিপক্ষ দলগুলোর অভিযোগের পালে হাওয়া দিচ্ছে। তবে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড বা আর্লিং হালান্ডের নরওয়েকে টপকে সেমিফাইনাল ও পরে ফাইনালের পথ পাড়ি দিতে হলে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই আর্জেন্টিনাকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কেবল ভাগ্যের জোরে বা রেফারিদের সহায়তায় নয়, বরং নিজেদের যোগ্যতায় বিশ্বসেরা।