আশাহত জাতির চোখে নতুন আশার বাতি

তৌহিদুর রহমান
  ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:০৪


বিরল প্রতিভার লেখক-নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকে মনে পড়ছে। তিনি বেঁচে থাকতে বহুবার ভেবেছি কথাটা। একবার তাঁর কাছে যাব; তাঁর গল্পের উল্টাপাল্টা চরিত্রগুলোর মতো আরেকটা চরিত্র সৃষ্টি করার বায়না ধরব। চরিত্রটা হবে এ রকম : একজন খুব ক্ষমতাধর পিতার এক তরুণ সন্তান।
ছেলেটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, আদরে-আহ্লাদে। তার বাবা একদিন হঠাৎ করে দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলেন। সঙ্গে মা-ভাই-বোনের সঙ্গে তরুণ ছেলেটাও। এমন পরিস্থিতিতে কী দেখি আমরা? দেখি যে ছেলেটা ক্ষমতাপুষ্ট হয়ে, খুব দ্রুত হয়ে উঠছে বেপরোয়া।
একে ধরছে, ওকে মারছে, তাকে শাসাচ্ছে—আমাকে চিনিস? এবার দেখবি মাইর কাকে বলে, যা খুশি তাই করব আমি! এরপর কী ঘটে? ওই বাবা-ক্ষমতান্ধ ছেলের অত্যাচারে চোখে অন্ধকার দেখে আশপাশের মানুষ।
এই বাস্তবতা আমাদের চিরচেনা। তো, হুমায়ূন আহমেদের আদলে আমার বানানো কল্পনার চরিত্রটি ছিল তার উল্টো। হঠাৎ ক্ষমতাধর এক পিতার তরুণ ছেলেটা গর্জে উঠে বলে—এবার আয়! ঠেকা আমাকে! আমি স্কুল বানাব।
গরিব বাচ্চাদের বিনাপয়সায় লেখাপড়া করাব। হাসপাতাল বানাব। বিনাপয়সায় চিকিৎসা করাব। কৃষকদের করে তুলব সবচেয়ে
সম্মানিত নাগরিক। শ্রমিকদের জন্য করব সমৃদ্ধ জীবনের ব্যবস্থা।
ইত্যাদি ইত্যাদি...। পারলে ঠেকা আমাকে, দেখি! একদম টেংরি ভেঙে হাতে ধরায়ে দেব...।
এ রকম একটা চরিত্রের আইডিয়া নিয়ে ওই রকম অসম্ভব মেধাবী-সৃজনশীল একজন লেখকের কাছে গেলে কী করতেন তিনি? আমি নিশ্চিত, তিনি বলে উঠতেন—গর্দভ! আমাকে ফাটাকেষ্টর লেখক পাইছিস? দূর হ সামনে থেকে!
কী করব বলেন? আমরা মেধাবী, প্রভিভাধর কেউ না। আমজনতা। অতশত বুঝি না। মোটা পেটে মোটা খাই। মোটা মাথায় মোটা চিন্তা করি। আমরা হলাম সাধারণ জনগণ। আমাদের চাওয়া-পাওয়া বেশি না। একটু সুখে-শান্তিতে থাকা—এই তো! কিন্তু সেই ব্যবস্থাটা করার জন্য যতবার যাদেরই আমরা ভোট-ভ্যাট, টাকা-ট্যাক্সসহ দায়িত্ব দিয়ে ‘লঙ্কায়’ পাঠাই, সে-ই হয় ‘রাবণ’। এ কারণে আমাদের মোটা মাথায় ফাটাকেষ্টর মতো চরিত্ররাই ঘোরাফেরা করে। তারাই আমাদের স্বপ্নের নায়ক। আমাদের বাস্তবের নায়করা কী রকম, সেটা গত ৫৬ বছর ধরে টের পাচ্ছি হাড়ে-মজ্জায়। এবার একটু কেমন কেমন যেন লাগছে! আজ পহেলা ফাল্গুনে যেন পশম-জাগানিয়া বসন্তের হাওয়ার পরশ লাগছে মনে। কেন? আসুন, একটু খতিয়ে দেখি।
এক দিন আগেই এই শীত-বসন্তের দেশে যেন খুলে গেল বহুদিনের বন্ধ দুয়ার—যার নাম ভোটাধিকার। যদিও এই দুয়ারে বড় একটা কপাট বন্ধ করে রাখা ছিল, তার পরও দেশের মানুষ হেসে-খেলে, হৈচৈ করে সারি বেঁধেছে; ভোট দিয়েছে মন ভরে। রেজাল্ট আমরা সবাই দেখলাম। আবারও বুঝিয়ে দিলাম, আমরা এই সেই জাতি, যারা ভোট দিতে না পারার কষ্ট মুখ বুজে সয়ে সয়ে একদিন ফেটে পড়ি আগুনে-বোমায়। তখন পালিয়ে বাঁচে রাবণ। তারপর রাম-লক্ষ্মণের রূপ ধরে আসে মুখোশধারীরা। সেই মুখোশ খুলতে দেরি লাগে না প্রকৃতির নিয়মেই। বেরিয়ে যায় আসল রূপ। দেখে নিভে যায় আগুনে-জাতি। রাগে-দুঃখে শুধু অভিশাপ জাগে মনে। টের পেয়ে পাততাড়ি গুটায় ওরা। দ্রুত আয়োজন করে ভোট দেওয়ার সুযোগের। আর এই সুযোগ নিয়ে আমজনতা দেখিয়ে দেয় তার সাংবিধানিক ক্ষমতা। বয়কট করে মুখোশধারী বিপ্লবীদের। প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীনতার শত্রু, ধর্মকারবারি-নারীবিদ্বেষীদের। দেশের দায়িত্ব তুলে দেয় পুরনো একটি দলকেই; তবে সেই দলের নেতৃত্ব এখন এমন একজনের কাছে, যাঁর সামনে আশার বাতিটা জ্বালানোই যায়। তাঁর নাম তারেক রহমান।
তারেক রহমান এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যান। ‘আপসহীন নেত্রী’ নামে খ্যাত, দেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, সদ্যঃপ্রয়াত খালেদা জিয়া এবং বীর-উত্তম মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক রাষ্ট্রপতি, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান দম্পতির সন্তান তিনি। নিঃসন্দেহে তাঁর শরীরে বইছে রাজনীতির নীল রক্ত। বাবা শহীদ হওয়ার পর দলের দায়িত্ব পড়ে মা খালেদা জিয়ার ওপর। তারেক রহমান তখন ১৪ বছরের কিশোর। বিস্মিত চোখে দেখেছেন ‘অসহায় গৃহবধূ’ মায়ের বিপুল জনপ্রিয়তা; ১০ বছরের মাথায় দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী; একসময় আপসহীন নেত্রী হয়ে ওঠার একেকটা গর্বিত অধ্যায়। ২০০১ সালে মায়ের দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর্বে তারেক রহমানের হাতেখড়ি হয় রাজনীতির পাঠে। তখন তারেক ৩৪ বছরের পরিপূর্ণ যুবক। পরের বছরেই তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। শুরু হয় তাঁর রাজনীতির মাঠে অবাধ বিচরণ। কিন্তু ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আটক করে তাঁকে। বছর দেড়েক কারান্তরীণ থেকে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান; কিন্তু চাপের মুখে ওই বছরই দেশ ছেড়ে সপরিবারে চলে যান লন্ডনে। সেখানে থেকেই পরের বছর ৮ ডিসেম্বর দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তারেক রহমান। দেশের ভেতরে মা আর নির্বাসনে ছেলেসহ গোটা দলের ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন। অসুস্থ হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। এক পর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করে দল চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় তারেককে। নির্বাসনে থেকেই সাধ্যমতো নেতৃত্ব দিয়ে যান দলকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অনুকূলে আসে পরিস্থিতি। এরপর দেশে ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে এবং মা খালেদা জিয়া অনেকটা মৃত্যুশয্যায় চলে গেলে তারেক রহমান টানা ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে গত ২৫ ডিসেম্বর ফিরে আসেন দেশের মাটিতে।
দেশে ফিরেই বিমানবন্দরের আঙিনায় প্রথমে একমুঠো ‘দেশের মাটি’ তুলে নিয়ে তারপর উপস্থিত লাখো জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে যখন উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন—‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান.../উই হ্যাভ আ প্ল্যান...’; তখনই কোটি মানুষের মতো আমাদেরও মনে জ্বলে ওঠে নতুন আশার বাতি। চোখে ভাসতে থাকে ঘটনাপরম্পরা। ধীরে ধীরে গাঁথা হতে থাকে আশা-নিরাশা আর যুক্তি-আবেগের দীর্ঘ মালা।
মালাটা এ রকম : ৪১ বছর বয়স থেকে তারেক রহমান বসবাস করেছেন ব্রিটিশ রাজধানীতে, যেই ব্রিটিশ নেতারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে বলিয়ান হয়ে গোটা পৃথিবীতে রাজত্ব কায়েম করেছে; অন্যদের ওপর শোষণ-নিপীড়ন-লুণ্ঠন চালিয়ে নিজেদের দেশ ও জনগণকে সমৃদ্ধ করেছে; জাতিকে এগিয়ে নিয়েছে বহুদূর। সেটা আরেক গল্প। তবে সেই দেশে বসে আরেকটা দেশের প্রতিভূ হয়ে তারেক রহমান নিশ্চয়ই নিবিড়ভাবে দেখেছেন—কিভাবে একটা দেশ ও জাতিকে গণতন্ত্র ও সুশাসনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা যায়; কিভাবে নিজের দেশের জনগণকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উন্নত জীবনের স্বাদ দেওয়া যায়।
তারেক রহমান নিশ্চয় দেখেছেন, ওই দেশের মানুষের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কতটা বদ্ধপরিকর; সরকার কতটা মরিয়া। কেননা জনগণের সন্তুষ্টির ওপরই তো নির্ভর করে ওদের সরকারের টিকে থাকা, না থাকা। নিশ্চয় তিনি দেখেছেন, জনগণের কষ্টার্জিত টাকায় জীবিকা নির্বাহ করে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন; দেশের উন্নয়ন কাজে সেই টাকা খরচ করায় কতটা সতর্ক ওরা; কতটা জবাবদিহি করতে হয় ওদের। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে; জনগণের সেবায় নিয়োজিত রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটা অঙ্গকে জনকল্যাণমুখী করে রাখা আর সর্বোপরি গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দেওয়া কতটা অতি জরুরি—এসব খুব কাছে থেকে দেখেছেন, নিশ্চয় বুঝেছেন তিনি।
দূর থেকে নিজের দেশের দিকে তাকিয়েও তারেক রহমান নিশ্চয় এটাও দেখেছেন, রাজনৈতিক দমন-পীড়নে আপাত সাফল্য কিভাবে নিজেদের দানব করে তোলে; তখন নিজের জনগণ, নিজের ভোটারকেও শোষণ-শাসন-নিপীড়ন করতে একটুও বাধে না এবং তার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে একসময় নির্মম পতন ঘটে, সেই দানবের—এর সবকিছুই এক রকম তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছে, যেহেতু প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর দূর বলে কিছু নেই।
আবার নিজের কিছু সদিচ্ছা থাকলেও ক্ষমতা ধরে রাখার মোহে অযোগ্য-অথর্ব, স্বার্থান্বেষী দুষ্টচক্রকে প্রশ্রয় দিলে, একসময় ওদের তোষামোদিতে ‘অন্ধ’ হয়ে যেতে হয় এবং খাদের মধ্যে পড়তে হয় নিশ্চিতভাবে, সেটাও দূর থেকে দেখার কথা তাঁর।

এত কিছু দেখে দেখে, ১৭টি বছর পরে নিশ্চয় তারেক রহমান যথেষ্ট প্রজ্ঞাবান হয়েই দেশে ফিরেছেন কোমর বেঁধে। তাঁর মুখে ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ শুনে সেই আশা জেগে ওঠা কি দোষের?
মিরাক্যাল কিছু না ঘটলে তারেক রহমানই যে দেশের হাল ধরছেন, তা প্রায় নিশ্চিত। দেশের মানুষ হতাশ হতে হতে যখন নিভে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখন একটা সুযোগ এলো আশীর্বাদ হয়ে। আমাদের সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে—‘প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ গত পরশুদিনই বাংলাদেশের জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের ক্ষমতা কাকে বলে! মনের সুখে ভোট মেরে উড়িয়ে দিয়েছে সব ‘অপশক্তি’।
সংবিধানে দেওয়া এই শক্তির জোরে আর গণতন্ত্রের সংজ্ঞা তুলে নিশ্চয় আজ বলতে পারি, ‘আমরা জনগণ আপনাদের ভোট দিয়ে সরকার গঠনের রায় দিয়েছি। আমাদের সবার জীবনের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা-সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের সব আয়োজন সুসম্পন্ন করবেন; রাষ্ট্রযন্ত্রের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুষ্ঠুভাবে কার্যকর রাখার ব্যবস্থা নেবেন। এসবের জন্য যা রসদ লাগে, ভ্যাট-ট্যাক্সের মাধ্যমে আমরা তার জোগান দিয়ে যাব।

জানি, কাজগুলো সহজ নয়। যত সহজে বলা সম্ভব, তত সহজে করা প্রায় অসম্ভব। ভেতরে-বাইরে শত্রু-অপশক্তির অন্ত নাই। তাই শুভকাজেও এখন দরকার সুকৌশল, যা কিছু দরকার, সবই করার দায়িত্ব তো সরকারেরই।
এটাও সত্য—সরকার সফল হবে তখনই, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ হবে সুনাগরিক। আবার সুনাগরিক গড়ে তোলার দায়িত্বও থাকবে সরকারের। কাজটা বড়ই জটিল, বড়ই কঠিন।
‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’ বলেই তো মহান বিশ্বনেতারা দৃঢ়প্রত্যয়ে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন নিজের দেশের জনগণের। তাঁদেরই একজন মার্টিন লুথার কিংয়ের প্রত্যয়দীপ্ত অমর বাণী ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ অন্তরে ধারণ করে আমাদের একজন নির্যাতিত-নির্বাসিত নেতা যখন দেশে ফিরে বজ্রকণ্ঠে বলে ওঠেন—‘আই হ্যাভ আ প্লান’; তখন আর সেটা নিছক কোনো উচ্চারণ থাকে না। আশার বাতি হয়ে জ্বলে ওঠে কোটি মানুষের প্রাণে।
এবার সেই প্ল্যান বাস্তবায়ন করে, অন্ধকারে পথহারা জাতিকে আলোকিত করা হোক—এই রায়ই তো পাওয়া গেল বৃহস্পতির নির্বাচনে; তাই নয় কি? 
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, প্রশিক্ষক ও মেন্টর
সুত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন