ভোট বিভাজনের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে  কি বিএনপি!

সালেক উদ্দিন
  ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:২৭

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিএনপির জন্য আর পাঁচটা নির্বাচনের মতো নয়। এটি দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাজপথের আন্দোলন, কারাবরণ ও মামলা-হামলার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার সবচেয়ে বাস্তব সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগের ঠিক মাঝখানেই আজ বিএনপি যে গভীর সংকটের মুখোমুখি- তা হলো দলীয় বিভাজন ও ভোট বিভাজনের আশঙ্কা।
এই সংকট কোনও অনুমাননির্ভর আশঙ্কা নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে-বিএনপির ভেতরের বিদ্রোহী প্রার্থী ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত ৬০ থেকে ৬২টি সম্ভাব্য বিজয়ের আসনে শুধু ভোট বিভাজনের কারণেই বিএনপির  পরাজয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এটি ধীরে ধীরে একটি কাঠামোগত দুর্বলতায় রূপ নিচ্ছে, যা পুরো নির্বাচনি হিসাব-নিকাশই পাল্টে দিতে পারে।
রাজনীতিতে শূন্যস্থান বলে কিছু নেই। বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে সবচেয়ে কৌশলে কাজে লাগাতে চাইছে জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত রাজনৈতিক শক্তি এনসিপি। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় স্পষ্ট যে, তারা এখন আর বিএনপির সঙ্গে সরাসরি শক্তির লড়াইয়ে যেতে চাইছে না, বরং বিএনপির ভোট ভাঙনের ওপর ভর করেই বিএনপির পরাজয় নিশ্চিত করার হিসাব কষছে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
ঢাকা, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজশাহী কিংবা উত্তরবঙ্গ—প্রায় সর্বত্রই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রার্থীর বিপরীতে দল থেকেই উঠে আসা স্বতন্ত্র বা নীরব বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ভোট ভাগ হচ্ছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীরা নিজেদের সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করেছে।
এটি নিছক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়। মাঠের প্রচারণা, নেতাকর্মীদের অবস্থান, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যেও এই আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট। কোথাও প্রকাশ্যে, কোথাও আড়ালে একটি কথাই বারবার শোনা যাচ্ছে,
“বিএনপিকে হারাতে আমাদের অত শক্তির দরকার নেই; তাদের ভাঙনই যথেষ্ট।”
বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা বাইরের কেউ নন। তারা দলেরই দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা। অনেকেই ১৫-১৬ বছর ধরে মাঠে সক্রিয়, জেল খেটেছেন, মামলা মোকাবিলা করেছেন। স্থানীয়ভাবে তারা পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখ; অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিক প্রার্থীর চেয়েও বেশি জনপ্রিয়। এখানেই সমস্যার মূল।
ভোটারদের সামনে তখন প্রশ্ন দাঁড়ায়-প্রতীক না মানুষ?
এই দ্বিধাই বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। নির্বাচনি বাস্তবতায় মাত্র ৫-৭ শতাংশ ভোট বিভাজন একটি নিশ্চিত আসনকেও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। আর যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থীরা সক্রিয়, সেখানে এই বিভাজনের মাত্রা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও একটি বিষয় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিএনপির বিদ্রোহীদের বড় অংশই বিশ্বাস করে-স্বতন্ত্র হিসেবে জিতলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি তাদের গ্রহণ করবে। অর্থাৎ তারা স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ালেও জানে, তারা আদতে স্রোতেরই অংশ।
এই বাস্তবতায় বহিষ্কার, হুঁশিয়ারি কিংবা কঠোর সাংগঠনিক শাস্তি খুব বেশি কার্যকর হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি ক্ষোভকে আরও গভীর করছে। কারণ নির্বাচনের মুখে রাজনীতি শেষ পর্যন্ত চলে বিশ্বাস, সম্মান ও পারস্পরিক স্বীকৃতির ওপর।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এখনও কি উদ্ধার সম্ভব?
উত্তর হলো: হ্যাঁ, সম্ভব। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। কারণ তিনি এখনও দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে সর্বজনগ্রহণযোগ্য। বিদ্রোহী প্রার্থীদের সঙ্গে শাস্তির ভাষায় নয়, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষায় বসতে হবে তাঁকে।
এই আলোচনার মূল বার্তা হতে হবে স্পষ্ট-তাদের দীর্ঘদিনের ত্যাগের স্বীকৃতি থাকবে, নির্বাচনের পর সাংগঠনিক মূল্যায়ন ও দায়িত্ব বণ্টনের বাস্তব প্রতিশ্রুতি থাকবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-তারা বিএনপির বাইরের কেউ নন, কখনোই ছিলেন না।
এই আশ্বাস যদি তারেক রহমান নিজে দেন, তাহলে অনেক বিদ্রোহী বুঝবেন-এই মুহূর্তে দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে আনা ব্যক্তিগত জয়ের চেয়েও বড় রাজনৈতিক বিনিয়োগ। কারণ বাস্তবতা তারা নিজেরাও জানে-বিএনপির বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।
এই নির্বাচন বিএনপির জন্য কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই নয়; এটি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দলীয় পরিণত হওয়ার পরীক্ষা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-বড় দল সাধারণত প্রতিপক্ষের হাতে নয়, নিজেদের বিভাজনেই বড় সুযোগ হারায়।
আজ যদি বিএনপি এই ভোট বিভাজন সামলাতে ব্যর্থ হয়, তবে জামায়াত ও এনসিপির ক্ষমতার স্বপ্ন বাস্তব করতে আর কিছুই লাগবে না। বিএনপির ভাঙনই যথেষ্ট হবে।
সময় এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস এই প্রশ্নই রাখবে— সুযোগ হাতে রেখেও কেন বিএনপি নিজেকেই হারাল?
লেখক: কথাসাহিত্যিক
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন