
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংলাপ শুরু হয়েছে— এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে কেবল বার্তা আদান-প্রদান চলছে, তবে সেটিকে কোনোভাবেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা সংলাপ বলা যাবে না।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে আবার আলোচনার কথা বলছে— যা পরস্পরবিরোধী অবস্থান। তার ভাষায়, “এই পরিস্থিতিতে আলোচনায় যাওয়ার অর্থই হলো দুর্বলতা প্রকাশ করা।”
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। এমনকি হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি শান্তি চুক্তিতে না আসে, তবে দেশটির ওপর “নরক নেমে আসবে”। তার দাবি ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে চলমান আলোচনার ফল ইতোমধ্যে ইতিবাচক।
তবে এই বক্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা করে আরাগচি স্পষ্ট করেন, “এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি এবং আমাদের নীতি হলো প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া।” তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের মধ্যে সংলাপের তাড়াহুড়ো করা মানে কার্যত পরাজয় মেনে নেওয়া।
একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাঠানো ১৫ দফার একটি প্রস্তাব ইরানের হাতে পৌঁছেছে। সেই প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি নয়, বরং বিভিন্ন মিত্র দেশের মাধ্যমে বার্তা বিনিময় চলছে। তার ভাষায়, “প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে, তবে এটিকে কোনোভাবেই আলোচনার পর্যায়ে নেওয়া যাবে না।”
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তেহরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পেতে পারে। তবে তার দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করে ইরান ইতোমধ্যে একটি কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
আরাগচির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও তা এখনও আনুষ্ঠানিক সংলাপের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বরং উভয় পক্ষই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান শক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
হরমুজে ৬ দেশের জাহাজে হামলা নয়, নিরাপত্তা দেবে ইরান
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি-তে বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপত্তা পাবে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, এই দেশগুলোর জাহাজে কোনো ধরনের হামলা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি জানান, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি, বরং জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “অনেক দেশ তাদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তাদের মধ্যে কয়েকটি দেশকে আমরা মিত্র হিসেবে বিবেচনা করি।”
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সিদ্ধান্ত নিয়েছে— চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, ভারত এবং বাংলাদেশ— এই ছয় দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে কোনো হামলা চালানো হবে না। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে এবং তারা সমন্বয় করে চলতে সম্মতিও জানিয়েছে।
আরাগচি আরও বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও এই ছয় দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ চলাচলের সুযোগ পাবে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও এই নিরাপত্তা অব্যাহত থাকবে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ইরান, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে এবং তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
ইরান আগেও জানিয়েছিল, এই নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ কেবল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে প্রযোজ্য হবে। ‘অমিত্র’ নয় এমন দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।
তবে নিরাপত্তা সুবিধা পেলেও নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মানতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো— হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে ইরানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
এদিকে ইরানি সংবাদমাধ্যম ফার্স জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী বিদেশি জাহাজের ওপর টোল আরোপের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত আইনের খসড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বোঝা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান একদিকে সামরিক কৌশল বজায় রাখছে, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলোর জন্য সীমিত নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রিত চলাচলের সুযোগ রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।