রাশিয়ার তেল নিয়ে নতুন সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ০৭ মার্চ ২০২৬, ০০:১৭

রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের জন্য সাময়িক ছাড় ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে আপাতত কিছুটা স্বস্তি পেলেও ভবিষ্যতে এর মধ্যে বড় ধরনের কৌশলগত সংকেত লুকিয়ে থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা রাও।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় নিরূপমা রাও বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলো প্রায়ই নিষেধাজ্ঞা ছাড় অথবা বিশেষ অনুমতির মতো কূটনৈতিক উপায় ব্যবহার করে অন্য দেশগুলোর নীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ভারতের ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই কৌশলই কাজ করছে বলে তিনি মনে করেন।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে ভারতের জন্য সীমিত সময়ের একটি ছাড় দেওয়া হয়েছে। এই ছাড়ের ফলে ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলো ৩০ দিনের জন্য রাশিয়ার তেল কিনতে পারবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শক্তি নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তেল এবং গ্যাস উৎপাদন বর্তমানে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই অবস্থায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারতকে সাময়িক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে এই অনুমতি সম্পূর্ণ অস্থায়ী এবং এটি মূলত সমুদ্রে আটকে থাকা তেলের লেনদেনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ফলে এই ব্যবস্থায় রাশিয়ার সরকারের বড় ধরনের আর্থিক লাভ হবে না বলেই মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ভবিষ্যতে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল কিনবে বলে ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতসহ অনেক দেশ বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সাময়িক ছাড়কে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব নিরূপমা রাও বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে গভীর ভূরাজনৈতিক বার্তা রয়েছে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। নিরূপমার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা খুবই স্পষ্ট। সংকটের সময়ে তারা ভারতের সঙ্গে নমনীয় আচরণ করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জ্বালানি নীতি যেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের কাছাকাছি থাকে সেটিই তাদের প্রত্যাশা।
তার মতে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারত আপাতত রাশিয়ার তেল কিনতে পারবে। তবে তা ওয়াশিংটনের অনুমতির কারণেই সম্ভব হচ্ছে এবং তা সীমিত সময়ের জন্যই।
তিনি বলেন ভবিষ্যতে ভারতের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে সরে আসে সেই প্রত্যাশাও এই সিদ্ধান্তের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে। তার মতে, বড় শক্তিগুলো প্রায়শই তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিষেধাজ্ঞা ছাড় অথবা বিশেষ অনুমতির মতো নীতিগত পদক্ষেপ ব্যবহার করে। এই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা মিত্র দেশগুলোর নীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।
তার মতে, ভারতের ক্ষেত্রেও এখন সেই কৌশলই দেখা যাচ্ছে, ভারতের কূটনীতি দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি অনুসরণ করে এসেছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভর না করে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তিত হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন। তার মতে নয়াদিল্লি ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বলয়ের কাছাকাছি চলে আসছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যে ভারতের অবস্থান অনেকটা সতর্ক এবং মাপা।
এই অবস্থান আপাতত ভারতের জন্য কিছু কূটনৈতিক সুবিধা তৈরি করছে বলে মনে করেন নিরূপমা রাও। তিনি বলেন, অশান্ত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা খুঁজতে গিয়ে ভারত আংশিকভাবে নিজের কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে। তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। বিশ্ব রাজনীতি এবং জ্বালানি কূটনীতির সামগ্রিক চিত্র এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ফলে ভবিষ্যতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার তেল নিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি বাজারের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা। বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক সংঘাত জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করছে। ফলে তেলের দাম সরবরাহ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক সবকিছুই একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। নিরূপমা রাওয়ের সতর্কবার্তাও মূলত সেই বাস্তবতাকেই সামনে তুলে ধরেছে বলে মনে করা হচ্ছে।