সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়ার পরও চাওয়া হচ্ছিল মুক্তিপণ

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৩ জুন ২০২৬, ১৩:৪৯


ভূমধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের লারনাকা শহরে কাজে যোগ দিতে বের হওয়ার ১০ দিন পর শাহরিয়ার আহমেদ ওরফে ইমন (২২) নামের বাংলাদেশি এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে দেশটির পুলিশ। গত রোববার লারনাকা শহরের কোফিনু এলাকার একটি স্থানে মাটিচাপা দেওয়া তাঁর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ১১ জুন রাত নয়টার পর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিখোঁজ হওয়ার রাত থেকে গত রোববার লাশ উদ্ধারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত শাহরিয়ারের মুঠোফোন ব্যবহার করে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে বাবা নাসির মিয়ার কাছে ৩৫ হাজার ইউরো (৫০ লাখ টাকা) মুক্তিপণ চেয়ে আসছিলেন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা।
নিহত শাহরিয়ার আহমেদ নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে শাহরিয়ার সবার বড়। তিন মাস আগে শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে গিয়েছিলেন তিনি। সাইপ্রাসের লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় তিনি বসবাস করতেন।
শাহরিয়ার আহমেদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে রোববার শাহীন বাবু (২২) নামের বাংলাদেশি এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে সাইপ্রাস পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যেই শাহরিয়ারের মাটিচাপা দেওয়া লাশ ও হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশের বরাতে জানিয়েছেন স্বজনেরা। তবে গ্রেপ্তার ওই তরুণ শাহীন বাবুর বাড়ি বাংলাদেশের কোন এলাকায়, তা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
সাইপ্রাস পুলিশের বরাত দিয়ে নিহত তরুণের স্বজনেরা বলেন, নিখোঁজ হওয়ার রাতেই শাহরিয়ারকে হত্যা করা হয়। ছুরিকাঘাতে হত্যার পর লাশটি মাটিচাপা দেওয়া হয়। এ ঘটনার তদন্তে নেমে শাহরিয়ারের মুঠোফোনটি পুলিশ উদ্ধার করে ওই তরুণের কাছ থেকে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।
শাহরিয়ারের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তিন মাস আগে রোজার শেষ দিকে শাহরিয়ার শিক্ষার্থী ভিসায় সাইপ্রাসে যান। দেশে অবস্থানের সময়ই অনলাইনে সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে যাওয়ার পর তাঁর খরচ হিসেবে প্রতি মাসে ৪০–৫০ হাজার টাকা পাঠাতে হতো। সেখানে একটি কাজ জোগাড় করার চেষ্টা করছিলেন তিনি, যাতে বাড়ি থেকে আর টাকা নিতে না হয়।
১১ জুন বিকেলে মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় শাহরিয়ারের। তিনি মাকে জানান, ‘আজকে একটি চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। নাইট ডিউটি। আজ রাতেই জয়েন। দোয়া কইরো।’ চাকরি পাওয়ার খবরটি গ্রিসপ্রবাসী বাবা নাসির মিয়া এবং সাইপ্রাসের রুমমেট (একই গ্রামে বাড়ি) রায়হান মিয়াকে জানান তিনি। রায়হান তাঁকে বলেছিলেন, ‘সেখানে গিয়ে লোকেশন পাঠাস।’ কোনো সমস্যা হলে যেন যোগাযোগ করেন, সেটিও বলেন তাঁকে। স্থানীয় সময় রাত ৯টায় কাজের স্থানে পৌঁছে রায়হানের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে লোকেশন পাঠান শাহরিয়ার। কিছুক্ষণ পর রায়হান ফিরতি মেসেজে ‘ওকে’ লিখলেও তা সিন হচ্ছিল না। রায়হান ভেবেছিলেন, হয়তো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তাই।
কিন্তু রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকেই বাবা নাসির মিয়ার কাছে একটি খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছি। ছেলেকে ফিরে পেতে চাইলে ৩৫ হাজার ইউরো দিতে হবে। যদি দেন ছেলেকে ফিরে পাবেন, না দিলে তাঁর চোখ ও কিডনি খুলে বিক্রি করে দেব।’ রাতেই বাবা রায়হান ও পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি জানান। সবাই ভেবে নেন, হয়তো হোয়াটসঅ্যাপ আইডি ‘হ্যাকড’ হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, পরদিন সকালে কাজ থেকে আর ফিরে আসেননি শাহরিয়ার। এরপরই রায়হান পুলিশ স্টেশনে গিয়ে রিপোর্ট করেন। পুলিশসহ পাঠানো ওই লোকেশনে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এদিকে ২৪ ঘণ্টাই অনলাইনে সচল ছিল শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর। প্রতিদিনই যোগাযোগ করা হচ্ছিল, টাকা চাওয়া হচ্ছিল।
শাহরিয়ারের ভাই নয়ন আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ শাহরিয়ারকে উদ্ধার করতে পারছে না দেখে আমরা মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে রাজি হই। দর-কষাকষি করে বাংলাদেশি পাঁচ লাখ টাকায় ডিল হয়। রোববার দুপুরে একটি ব্যাংকে যাই টাকা পাঠাতে। ওই সময় একবারের জন্য শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বলতে চাই আমরা। কিন্তু তারা রাজি হয়নি। ব্যাংক থেকে ফিরে আসি। রাত আটটার দিকে ফেসবুকে দেখি, সাইপ্রাস পুলিশ শাহরিয়ারের লাশ উদ্ধার করেছে। সাইপ্রাসে থাকা রায়হানসহ পরিচিতরা একই খবর আমাদের জানান।’
নিহত শাহরিয়ারের মা পাপিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলেরে যারা মারছে, তাদের বিচার চাই। আপনারা ছেলের লাশটা দেশে আইন্যা দেন, আমি একবারের জন্য ছুঁয়ে দেখব।’
রায়পুরার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘সাইপ্রাসে পড়তে যাওয়া রায়পুরার শাহরিয়ার নামের এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধারের খবর পেয়েছি। তবে বিষয়টি সাইপ্রাসের দূতাবাস থেকে এ পর্যন্ত আমাদের অফিশিয়ালি জানানো হয়নি। নিহত তরুণের পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তারা যদি সহযোগিতা চায়, মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’