
১৯ মে মঙ্গলবার জর্জিয়ার প্রাইমারি নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটি। ৩৬ বছর বয়সী নাবিলাহ পার্কস, জর্জিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদের ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। প্রাইমারির ফলাফলে তিনি জোশ ম্যাকলরিনের সঙ্গে ১৬ জুনের রানঅফে উঠেছেন। রানঅফ জিতলে এবং নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হলে তিনি হবেন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো অঙ্গরাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর—এক যুগান্তকারী ঐতিহাসিক অর্জন।
নির্বাচনী রাতে নাবিলাহ তার সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগময় বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “জর্জিয়ার মানুষ আজ রাতে বিপুল সংখ্যায় ভোট দিতে বেরিয়েছেন, কারণ তারা এই পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্লান্ত ও বিরক্ত। এত মানুষ আমার ওপর আস্থা রেখেছেন—এটা আমার কাছে এক বিশাল সম্মান। আমি একটি সাশ্রয়ী ও ন্যায্য অর্থনীতির জন্য লড়াই চালিয়ে যাব, যেখানে আমাদের সব পরিবার সমৃদ্ধ হতে পারবে।”
নাবিলাহর জন্ম আটলান্টায়, বেড়ে উঠেছেন নরক্রস ও লরেন্সভিলে। তার বাবা একজন বাংলাদেশি অভিবাসী, যিনি ইন্টারনাল রেভিনিউ সার্ভিসে ফাইল ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতেন। তার মা নোয়াখালীর মেয়ে। এই কর্মজীবী পরিবারের সন্তান হয়ে আমেরিকার রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসার এই গল্প শুধু নাবিলাহর একার নয়—এটি আমেরিকায় বসবাসরত প্রতিটি বাংলাদেশি অভিবাসীর স্বপ্নের গল্প।
তার মায়ের জীবনের একটি ঘটনা নাবিলাহকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে। মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যায় কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার পর একটি বিমা কোম্পানি তার মায়ের স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা অস্বীকার করার চেষ্টা করেছিল। সেই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাই তাকে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের একজন কট্টর সমর্থকে পরিণত করেছে। তিনি জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেছেন এবং পরিবারের প্রথম প্রজন্মের কলেজ গ্র্যাজুয়েট।
নাবিলাহ ২০২২ সালে গুইনেট কাউন্টির সপ্তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে জর্জিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত হন এবং হয়ে ওঠেন জর্জিয়া স্টেট সিনেটের প্রথম মুসলিম নারী। তিনি ছিলেন জর্জিয়া স্টেট সিনেটে নির্বাচিত সবচেয়ে কম বয়সী নারী, প্রথম দক্ষিণ এশীয় নারী এবং প্রথম মুসলিম সদস্য। সিনেটে তিনি প্রগতিশীল নীতির একজন সোচ্চার কণ্ঠস্বর এবং বাংলাদেশিসহ অভিবাসী সম্প্রদায়ের পক্ষে রিপাবলিকান-নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন আইনের বিরুদ্ধে বারবার সরব হয়েছেন।
নাবিলাহর এই যাত্রা সহজ ছিল না। রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রেগ ডোলেজাল এআই দিয়ে তৈরি একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে মুসলিমদের ভয় দেখিয়ে “জর্জিয়াকে শরিয়ামুক্ত রাখো” বার্তা দেওয়া হয়েছিল। এই জঘন্য ইসলামোফোবিক প্রচারণার মুখেও নাবিলাহ পিছু হটেননি; বরং আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন।
নাবিলাহ বলেছেন, “আমার জীবনের অভিজ্ঞতাই আমার কাজকে রূপ দিয়েছে। কষ্টকর জীবন পার করে আসা জর্জিয়ার মানুষ বিশ্বাস করতে পারেন যে আমি প্রতিদিন তাদের জন্য লড়াই করব, কারণ আমি তাদের সংগ্রামটাই বেঁচে এসেছি।” তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে মেডিকেইড সম্প্রসারণ, ওষুধের খরচ কমানো, বিমার মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং স্কুলের অর্থায়ন বৃদ্ধি।
এখন ১৬ জুনের রানঅফে নাবিলাহকে জোশ ম্যাকলরিনকে হারাতে হবে। তারপর নভেম্বরে সাধারণ নির্বাচন। পথটা দীর্ঘ, লড়াইটা কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাবিলাহ—আটলান্টার শহরতলিতে বেড়ে ওঠা এই সংগ্রামী নারী—এর আগেও অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।
আমেরিকার প্রতিটি বাংলাদেশি পরিবারের কাছে এই মুহূর্তে নাবিলাহ শুধু একজন প্রার্থী নন—তিনি আমাদের সম্মিলিত স্বপ্নের প্রতিনিধি। জর্জিয়ায় বসবাসকারী সকলের কাছে আহ্বান, ১৬ জুনের রানঅফে ভোটকেন্দ্রে যান, নাবিলাহর পাশে দাঁড়ান। কারণ তার জয় শুধু একজন মানুষের জয় নয়—এটি হবে আমাদের সকলের জয়, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।