বাংলা একাডেমির বুকে ফারুকীর ক্ষতচিহ্ন 

কাজী মাসুদুর রহমান। 
ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৪ মে ২০২৬, ০০:১০

- একদিন গুরুগৃহে সন্তানের খোঁজ নিতে গিয়ে অর্ধ জাহানের বাদশা আলমগীর দেখতে পান যে, তাঁর সন্তানের শিক্ষক নিজহাতে পা ধৌত করছেন এবং তাঁর সন্তান পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছেন। তা দেখে বাদশা বেশ ব্যথিত হলেন এবং শিক্ষক কে বিনীত অনুরোধে ডেকে পাঠালেন। বাদশা মহাশয়ের আদেশ ভেবে এক অজানা আশংকায় ভয়ার্ত শিক্ষক তাঁর সামনে হাজির হলেন। বাদশা জনৈক শিক্ষক কে কুর্ণিশ পূর্বক অনুনয়ের সুরে জানতে চান- কেন তাঁর সন্তান শিক্ষকের পা তার নিজহাতে ধুয়ে দেননি; সন্তানের এমন অপূর্ণ ও অনাদর্শিক শিক্ষা তাঁকে ব্যথিত করেছে। বীরবাহাদুর বাদশার এমন মহানুবতায় সেই শিক্ষক হতবিহ্বল হয়ে পরেছিলেন।পৃথিবীর ইতিহাসে শিক্ষকের প্রতি  মর্যাদা প্রদর্শনের এমন হৃদয়গ্রাহী দৃষ্টান্ত হয়তো দ্বিতীয়টি নেই।  কবি- কাজী কাদের নেওয়াজ এর কালজয়ী কবিতা ' শিক্ষা গুরুর মর্যাদা ' এর পংক্তিদ্বয়ে তা এভাবেই সশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে- ' আজ হতে চির উন্নত হলো শিক্ষা গুরুর শির/ সত্যই তুমি মহান উদার বাদশা আলমগীর।'  মহা বীর আলেকজান্ডার তাঁর শিক্ষাগুরু আ্যারিস্টল এঁর প্রতি এভাবেই তাঁর ভক্তি প্রকাশ করেছিলেন- ' To my parents I owe to life; to my teacher how to live worthily ' অর্থাৎ, বেঁচে থাকার জন্য  আমি আমার পিতামাতার কাছে ঋণী ; ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমি আমার শিক্ষকের কাছে ঋণী। ' গণতন্ত্রের মহান প্রবক্তা যুক্তরাষ্ট্রের কালজয়ী প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তাঁর সন্তানের শিক্ষককে লেখা ঐতিহাসিক চিঠিতে জনৈক শিক্ষককে ' মাননীয় মহাশয়' রূপে সন্বোধন করেছিলেন; সেই কালজয়ী চিঠিতে তিনি তাঁর সন্তানকে আলোকিত মানুষ রূপে গড়ে তুলতে সেই শিক্ষকেরই স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন। চিঠিটি  শিক্ষকের গুরুত্ব ও মর্যাদা'র ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে মূল্যায়িত হয়ে আছে। পদার্থ বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রফেসর আব্দুস সালাম ১৯৭৯ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন। আন্তর্জাতিক সন্মানের এই অসামান্য পদকটি তাঁর শিক্ষা গুরু( যার কাছে তিনি ১৯৩৪ - ১৯৩৮ সাল অবধি গণিত শিক্ষা নিয়েছিলেন) অনিলেন্দু গাঙ্গুলি কে উৎসর্গ করতে তিনি ভারতে ছুটে গিয়েছিলেন; জীবন সায়াহ্নে ক্লান্ত শিক্ষকের চরণ তলে প্রণামাবনত হয়ে গুরুর শীর্ণ হাতে পদক সমর্পণ করে বলেছিলেন - ' এই পদকটির ওপর যোগ্য অধিকার আমার চেয়ে আপনারই বেশী '। শিক্ষক হয়েও শিক্ষকের প্রতি এমন ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শন সত্যিই  স্মরণীয় ও অনুকরণীয় এক নিদর্শন।

প্রসঙ্গত: বিগত পহেলা ফেব্রুয়ারী'২৫ এ অমর একুশে বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ ও জাতীয় পুরষ্কার হিসাবে খ্যাত ' বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরষ্কার-২০২৪' প্রদান করা হয়। তখন সাতজনকে পুরষ্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।  সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীন হওয়ায় সংগত কারণেই সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী'র নেতৃত্বে তা অনুষ্ঠিত হয়।সেখানে প্রধান উপদেষ্টাও উপস্থিত ছিলেন।পুরষ্কার গ্রহনে প্রবন্ধ/গদ্য শাখায় মনোনীত সূধী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রথিতযশা আলোচক-সমালোচক, গবেষক, পণ্ডিত সর্বোপরি শিক্ষক শ্রদ্ধেয় সলিমুল্লাহ খান।অনুষ্ঠানের ফটোসেশন পর্বে তারা নিজেরা বসে থেকে পুরষ্কৃত ও সন্মানিত সকলকে পেছনে দাঁড় করিয়ে রেখে ফটোসেশন করেন।বিষয়টি সচেতন মহলে তখন তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।  প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। দাবী উঠেছিল পুরষ্কার ফেরৎ দানেরও। বাঙালির প্রাণের উৎসব মুখর এই সভ্য অনুষ্ঠানে এমন শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণে তখন চরমব্যথিত হয়েছিল তাবৎ শিল্পাঙ্গন। ব্যথিত হয়েছিল সকল সুবোধ্যাগণ। ছাত্রতুল্য হোস্ট নিজে বসে শিক্ষককে দাঁড় করিয়ে বাংলা একাডেমির মতো এমন সভ্যপ্রাঙ্গনে এমন ফটোসেশন নিশ্চয়ই প্রজন্মের তরে কোনো শুভ শিক্ষা হতে পারেনা।শুধু শিক্ষকের উপস্থিতিতেই নয়, আয়োজক/প্রদায়কগণ(সে যে মাপেরই হোক) বসে থেকে পুরষ্কারের জন্য মনোনীত সন্মানিত যে কোনো সূধীকে দাঁড় করিয়ে রাখার এমন আচরণ কখনই শিক্ষণীয় শালীনতা হতে পারেনা। বিশেষ করে বাংলা একাডেমির মতো সভ্য পাদপীঠে এমন দৃশ্যের অবতারণা খুবই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক বটে।কেননা, বাংলা একাডেমি আমাদের জাতীয় শিক্ষা ও সভ্যতার প্রতীক। এটি গবেষণা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য একটি বিশেষায়িত জায়গা। এখান থেকে সৃজনশীল তথা উৎকর্ষিত চেতনার উম্মেষ ঘটবে। সংঘটিত ঘটনায় প্রজন্ম কি শিক্ষা পেল? আমরা কি ম্যাসেজ পেলাম? শিক্ষক ও গবেষক সলিমুল্লাহ খান তার প্রতিক্রিয়ায় যথার্থই বলেছিলেন- “আমি বলেছি, তারা ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বসেছে। বাংলা একাডেমি যদি মানুষকে সম্মান প্রদর্শন করতে না জানে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব নাকি? তাদের আদব-কায়দা যদি না থাকে আমরা কী করব?”তিনি আরও বলেন, "সকলেই যদি আমরা সমান না হই, তাহলে আমরা এক হব না। ২৪ এর আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল বৈষম্যবিরোধী, এটা ‘সাম্য’ কথাটারই একটি অনুবাদ।” 
অর্থাৎ যে বৈষম্যেবিরোধী চেতনার স্ফুলিঙ্গে '২৪ জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল এবং যে স্ফুলিঙ্গের প্রভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে ফারুকী পদায়িত ও ক্ষমতায়িত ছিলেন, ফারুকীর আচরণ সেই চেতনার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিল মর্মে সচেতন মহল মনে করেন। প্রশ্ন জাগতে পারে, সৃষ্ট ঘটনায় শুধু ফারুকী-ই কেন টার্গেট হচ্ছেন? উত্তরটা সরল আর তা  হলো বাংলা একাডেমি এবং এতদসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী তারই দপ্তরের এখতিয়ার ভুক্ত ছিল।এছাড়া এ ঘটনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসাবে তিনি যে ব্যাখ্যা -বিবৃতি দিয়েছিলেন তাও যথেষ্ট অপ্রীতিকর, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। তিনি বলেছিলেন, "আপনারা সবাই জানেন, সরকার বা পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্টেজেই পুরস্কারপ্রাপ্তদের গ্রুপ ফটোসেশনের একটা রেওয়াজ চালু আছে। কিন্তু আমরা তো সংস্কার করতে আসা সরকার। আমাদের কেন রেওয়াজ মানতে হবে? আজকে আমাদের মন্ত্রণালয়ে এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছি গ্রুপ ফটোসেশনের এই রেয়াজ এ বছরের একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠান থেকে আর রাখা হবে না। গ্রুপ ফটোসেশন কোথায় কীভাবে হবে, এটা নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।" প্রশ্ন উঠেছে, চলমান এই রেওয়াজটা কি তাহলে অশালীন বা কুসংস্কারযুক্ত ছিল? তবে কোন নব্য রেওয়াজ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তিনি প্রচলিত রেওয়াজটা বাদ দিতে চান? তিনি যে শিষ্টাচার বিবর্জিত দৃষ্টান্ত চালু করলেন সেটাই কি তবে নতুন রেওয়াজ হিসাবে প্রতিস্থাপিত হবে? তিনি যেটা করেছেন সেটা কি কোনো শোভন রেওয়াজ?বিদ্যমান রীতিতে মনোনীত ও আগত সূধীদের দাঁড়িয়ে সন্মান জানালে কি তা অসভ্যতা হয়ে যেত ? তবে কি স্রেফ নিজের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য ও নিজের আমিত্ব ( i'm the greatest) প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সংস্কারের দোহাই দিয়ে স্বপক্ষীয় যুক্তি দাঁড় করিয়ে পুরো রেওয়াজটাই বাতিল করতে চেয়েছিলেন? তিনি তার এই বিতর্কিত কর্ম জায়েজ করতেই কি এমনটা বলেছিলেন? তখন এমন জ্বালাময়ী প্রশ্নগুলো সচেতন মহলকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। লক্ষ্যণীয় যে, তার এই প্রতিক্রিয়ায় তিনি কার্যত ক্ষমতার বাদশাহী 'অহং' এরই প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন মর্মে সচেতন মহলে তখন তিনি ধিকৃত হয়েছিলেন। প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিগত সরকারের ফ্যাসিস্ট কর্মকান্ডগুলো সামনে এনে ঘটনা সংশ্লিষ্ট নিজের লালিত ও প্রকাশিত হীনমন্যতা ছাইচাপা দেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছিলেন মর্মে সচেতন মহলে তখন ধারণা জন্মেছিল।
স্মর্তব্য, গেল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সমগ্র দেশব্যাপী শিক্ষকদের জীবন ও জীবিকার ওপর নজিরবিহীন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তখন শিক্ষক সমাজের ওপর যে ঘোর অনামিশা নেমে এসেছিল তা ছিল সমকালীন সভ্যতার ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। বাংলা একাডেমির মত সভ্য প্রাঙ্গণে ফারুকীর সেই অসভ্য আচরণ ছিল সেই গহীন অন্ধকারেরই প্রতিফলন! তার ঐ অসভ্য আচরণ সেই অন্ধকারে যথেষ্ট কুপ্ররোচনা যুগিয়েছিল। এটা তার শিক্ষক বিদ্বেষী 'মেটিকুলাস ডিজাইন' এরই অংশ হিসাবে প্রতীয়মান হয়।
 উল্লেখ্য,  '২৫ এর একুশে বই মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল- 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ'। পরিস্থিতিগত কারণে প্রশ্ন জাগে যে, সেই নতুন বাংলাদেশ কি আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে অতীতের নষ্ট ও ভুল শুধরানোর শিষ্টাচারে শুচিশুদ্ধ হয়ে উঠবে? নাকি, প্রতিহিংসা ও দাম্ভিকতার নতুন কোনো অপসংস্কৃতির জন্ম দিবে? পরিলক্ষণীয় , কথিত ফ্যাসিজমের দোহাই দিয়ে আমলা, কামলা সহ অনেকেরই মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। কথায়-কথায় শুধু 'ফ্যাসিস্ট' ও 'ফ্যাসিস্টের দোসর' দোহাই দিয়ে জান্তে- অজান্তে প্রতিহিংসাপরায়নতার নতুন কোনো অশোভন ও ভয়ংকর সংস্কৃতি যাতে আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা না পায় সে বিষয়ে আমাদের সকলেরই সজাগ থাকা উচিৎ। আত্মোপলব্ধি এনে এখনই এর রাশ টানতে হবে।

লেখক- কলামিস্ট।