।। সুবর্ণার করুণ মৃত্যু এবং আইন-বিচারের আর্তনাদ।।

কাজী মাসুদুর রহমান।
ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৪ মে ২০২৬, ২৩:২৭

 

'কাল' হলো সেই বিমূর্ত আধার যার অনন্ত আঁধারে প্রতিনিয়তই বিলীন হয়ে যায় বিশ্বসংসারে ঘটে যাওয়া বিচিত্র সব অসংখ্য ঘটনার অম্লমধুর কাহিনী। কালের শাশ্বত ধারা এমনই। এভাবেই বৈচিত্র্যময় কাহিনীর অতল সম্ভার অসীম বক্ষে ধারন করেই কাল রচে মহাকাল। তবে কিছু হৃদয়বিদারক মর্মস্পর্শী ঘটনাবলী আছে যা কালের নিঠুর গ্রাসে বিস্মৃত হলেও তৎসদৃশ চলমান কোনো বিষয় বা বিষয়াবলী অতীতের সেই বিস্মৃত বিষাদকেই জাগিয়ে তোলে; ফলে, পুনরায় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে মন ও মনন। এ যেন শীতল ছাইয়ের তলে লুকিয়ে থাকা জ্বলন্ত অথচ সুপ্ত আগুন যা কোনো প্রভাবকের স্পর্শে বিদগ্ধ নীলাভ শিখায় পুনরায় স্ফুলিঙ্গ ছড়ায় ! সাম্প্রতিককালে গায়েবি মামলায় বিচারবিহীন অবস্থায় 'শ্যোনঅ্যারেস্ট' এর নামে মানবেতর হয়রানি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সেই নজিরবিহীন নিষ্ঠুর প্রতিহিংসার ঘৃণ্য কর্মকান্ডগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এর মধ্যে নিম্নের ব্যথিত কাহিনীটি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। ঘটনাটি হলো-  গত ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ এ বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের সাবেকডাঙা গ্রামে সংঘটিত কানিজ সুবর্ণা(২২) ও তার শিশু সন্তান(৯মাস) এর মর্মান্তিক অপমৃত্যু। 

সুবর্ণা ছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলা সভাপতি, জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম এর স্ত্রী। সেই হৃদয়বিদারক অপমৃত্যুকে ঘিরে তখন দেশব্যাপী বিষাদের ছায়া নেমে এসেছিল এবং একইসাথে সমালোচনার ঝড় বইছিল। বর্ণনা মতে, গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাদ্দাম আত্মগোপনে ছিলেন। তার স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা সন্তান সম্ভবা থাকা অবস্থাতেই ২০২৫ এর এপ্রিলের শুরুতে তিনি গোপালগঞ্জ থেকে আটক হন। পরবর্তীতে শিশুসন্তান কে বাবার স্নেহের স্পর্শ দেওয়ার প্রবল আশায় সুবর্না তার স্বামী সাদ্দামের জামিনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি লেন। এ বিষয়ে তার আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বিবিসি বাংলাকে তখন জানিয়েছিলেন যে , সাদ্দামকে যে মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে সেখানে অভিযুক্তদের তালিকায় তার নাম ছিলনা; অজ্ঞাতনামাদের একজন হিসেবে তাকে গ্রেফতার করা হয়; তার বিরুদ্ধে অভিযোগও প্রমাণ হয়নি; এরপর আমরা একটা মামলার জামিন করি আরেকটা মামলা দেয়। 

সাদ্দামের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মামলা পরিচালনায় হয়রানি বাড়ানোর জন্য তাকে বাগেরহাট থেকে যশোর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। প্রতিবারই জামিনের খবরে নয় মাসের শিশু সন্তানকে বুকে জাপটে ধরে স্ত্রী সুবর্না পাগলের মতো বাগেরহাট থেকে যশোর জেল গেটে ছুটে এসে অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান থাকতেন। কিন্তু প্রতিবারই সাদ্দামকে সন্দেহ জনক ভিন্ন মামলায় জেল গেটে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। এভাবে প্রতিবারই তার সুবর্ণা আশাহত হয়ে ফিরে যেতেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গভীর প্রণয় থেকে তারা পরিণয়ে আবদ্ধ হয়েছিলেন। স্বামীর প্রতি সুবর্ণার গভীর ভালবাসার কারণে প্রবল দুর্বলতা বিরাজমান ছিল। তার স্বামী আর মুক্তি পাবে না বলে চেনা মানুষরাও তার মন ভেঙে দেয়। এভাবে দূরাশায় হতাশায় জর্জরিত হয়ে ইতোমধ্যে সে তার জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে গত ২৩ জানুয়ারি নিজ নিবাসে প্রথমে তিনি শিশু সন্তানটিকে পানিতে চুবিয়ে মারেন এবং পরে নিজেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। এটাতো গেল ট্র্যাজেডির প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আরো করুণ, নির্মম, বিষন্ন, বিবর্ণ! পরবর্তীতে সাদ্দামের স্ত্রী ও শিশু সন্তানের লাশ দাফন করার জন্য বাগেরহাট জেলা প্রশাসক বরাবর পরিবারের পক্ষ থেকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আকুল আবেদন জানানো হয়। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিবৃতি দেওয়া হয় যে, সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে কোন আবেদন জানানো হয়নি। এমনই বিতর্কের মধ্যে আল জাজিরার প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সেই আবেদন প্রকাশ্যে আনেন যা পরবর্তীতে গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অবশ্য সেখানেও চলে চরম হয়রানি। সাদ্দাম যশোর জেলা কেন্দ্রীয়কারাগারে বন্দী হওয়ায় বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে যশোর জেলা প্রশাসকের নিকট প্যারোল আবেদনের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে এবার শনিবারের সাপ্তাহিক বন্ধের অজুহাত দেখানো হয়। সচেতন মহলে তখন এমন কথা উঠেছিল যে, এ ধরনের পরম মানবিক ইস্যুতে আইনের জিলাপিপ্যাঁচ না দেখিয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক স্বপ্রণোদিত হয়ে উক্ত আবেদনটি যশোর জেলা প্রশাসক বরাবর সরসরি ফরোয়ার্ড করেতে পারতেন। মানবিক বিবেচনায় তিনি তা অবশ্যই পারতেন। কিন্তু মানবিকতার অভাবে সেটা করেননি। এটা বুঝতে কাউকে পাক্কা কেরানি কিংবা ঝানু আমলা হওয়া লাগে না। এভাবে দীর্ঘঘন্টা চরম হয়রানি ও কালক্ষেপণের পর অবশেষে সাদ্দামের পরিবার নিরুপায় হয়ে লাশ দুটি নিয়ে সরাসরি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের সামনে হাজির হলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। কারাবন্দি সাদ্দামকে তার মৃত স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে ৫-১০ মিনিট দেখানোর জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে জেল কর্তৃপক্ষের নিকট জোর কাকুতি-মিনতি করা হয়। তবুও কর্তৃপক্ষের মন গলানো যায়নি। এমন করুণ দৃশ্যে উপস্থিত পুলিশ সদস্য সহ অন্যান্য দর্শনার্থীরাও অঝোরে কেঁদে ফেললে সেখানে এক বিষাদঘন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এমন পরম মানবিক ইস্যুতে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ার কারণে সামাজিক মাধ্যম সহ দেশব্যাপী যখন সমালোচনার ঝড় বইছিল তখন জেল কর্তৃপক্ষ মাত্র দু'তিন মিনিটের জন্য সাদ্দাম কে দেখার সুযোগ দেয়। উল্লেখ্য, বেঁচে থাকাকালীন শিশু কে এক মুহূর্ত কোলে নেওয়ার জন্য সাদ্দাম কর্তব্যরত পুলিশের পা পর্যন্তও জরিয়ে ধরেছিলেন মর্মে পরিবার সূত্রে জানা যায়। তবুও কর্তৃপক্ষের এতটুকুও করুণা জন্মেনি। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম সেদিনের বর্ণনায় বলেন,
"তিনি(সাদ্দাম )বাচ্চাটাকে আর কোলে নেননি। আমাদের বললেন জীবিত থাকতেই তো নিতে পারলাম না। এখন আর নিয়ে কী করবো। এরপর বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন- আমি ভালো বাপ হতে পারিনি, বাপ ক্ষমা করিস। ভাবীকে বললেন- ভালো স্বামী হতে পারি নাই, ক্ষমা করিস। এরপর সেখান থেকে এক টুকরো মাটি তুলে আমাকে দিয়ে বলেন আমার বউ বাচ্চার কবরে দিয়ে দিস। আমরা তাই করেছি।" এমন হৃদয়বিদারী ঘটনা অবলম্বনে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ তখন যথার্থই লিখেছিলেন, 'মৃত শিশু দেখা করতে গেছে তার জীবিত পিতার সাথে।' তার এই আবেগঘন ভাইরাল বাক্যটি সাধারণ মানুষের মনে তখন বিষাদের ঝড় তুলেছিল।

এদিকে সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়াকে সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন মনে করে তখন বিবৃতি দিয়েছিল আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এই ইস্যুতে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি অপরিহার্য উল্লেখ করে আসক বলছিল যে, এই বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিবৃতিতে মানবাধিকার এই সংগঠনটি বলেছিল, "বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী; অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেয়; ৩৫(৫) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না। একজন বিচারাধীন বন্দি হিসেবে সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন।
অথচ তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মৃত্যুজনিত চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা কার্যত তার প্রতি অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণ করা হয়েছে, যা সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।"
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছিল, "প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। ওই নীতিমালায় বলা হয়েছে— ভিআইপি বা অন্যান্য সকল শ্রেণির কয়েদি বা হাজতিদের নিকটাত্মীয় যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান এবং আপন ভাই-বোন মারা গেলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যাবে। এই নীতিমালা প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হলেও তা ইচ্ছামতো, নির্বিচারে বা কোনো যুক্তি প্রকাশ না করে প্রত্যাখ্যানযোগ্য নয়।
এই ক্ষেত্রে পরিবার কর্তৃক আবেদন জানানো সত্ত্বেও বিধান প্রয়োগ না করা আইনের উদ্দেশ্য ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনেও এই বিষয়ক অধিকার সুরক্ষিত।"

আসক আরো বলেছিল, "বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর) মেনে চলে, তার অনুচ্ছেদ ৭-এ নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১০(১) এ বলা হয়েছে, স্বাধীনতাবঞ্চিত সকল ব্যক্তির সঙ্গে মানবিকতা ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করতে হবে।
কারাফটকে পাঁচ মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মুখ দেখিয়ে একজন শোকাহত বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়া থেকে বঞ্চিত করা, আইসিসিপিআর’র উল্লেখিত ধারাসমূহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আসক আরো মনে করে, কোনো আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি, তা জানার অধিকার দেশের নাগরিকদের রয়েছে। আইনের শাসন কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়, সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ এবং সেই সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনার মাধ্যমে যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তা একটি সংবিধানস্বীকৃত, গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।" 

সংঘটিত ঘটনাবলীতে এভাবে দেশব্যাপী যখন সমালোচনার ঝড় বইছিল তখন গত ২৬ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা-২ শাখা থেকে প্যারোলে মুক্তির পূর্বের নীতিমালা বাতিল পূর্বক সংশোধিত নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে যাতে শর্তশিথিল করা হয়। প্রণীত নীতিমালার অনুচ্ছেদ ৪. এ বলা হয়েছে , 'জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে ঐ জেলার অভ্যন্তরে যে কোনো স্থানে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। অপরদিকে, কোনো বন্দি নিজ জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক না থেকে অন্য জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনা করে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। তবে উভয়ক্ষেত্রেই দুর্গম এলাকা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দূরত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর কিংবা না-মঞ্জুরের ক্ষমতা সংরক্ষন করবেন।' 

এমতাবস্থায় ঐ ২৬ জানুয়ারিতেই মহামান্য উচ্চ আদালত সাদ্দামের প্রতি মানবিক গুরুত্ব বিবেচনায় তাকে ৬ মাসের জামিন মঞ্জুর করেছিলেন। পূর্বের ন্যায় অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত মামলায় তাকে শ্যোন এ্যারেস্ট না দেখানোর ফলে অবশেষে তিনি মানবিক বিবেচনায় জামিনে মুক্তি পান। এমতাবস্থায় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল যে, সে-ই যখন মানবিক বিবেচনাতেই মুক্তি মিলল, তবে কেন  আগে মিলল না? যদি মিলতো তবে হয়তো নিষ্পাপ শিশুটির প্রাণ বেঁচে যেত! বেঁচে যেত তার স্ত্রীর প্রাণ। এমনকি প্যারোলেও যদি কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি মিলতো তবে সাদ্দামের কষ্টার্ত মন-প্রাণ কিছুটা হলেও সান্তনা পেত। সান্তনা পেত এ হেন মানবেতর ঘটনায় ব্যথিত সাধারণ মানুষগুলো। এই মুক্তি পিতার পানে শিশুর সেই নিষ্পাপ চাহনি ও দ্যুতিময় হাসি নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ফিরিয়ে দিতে পারবে না সুবর্ণার জীবন্ত স্বপ্ন , অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অনির্বাণ প্রেম।  এই মুক্তি হয়তো রাঙাতে পারবেনা নষ্ট রাজনীতির নিষ্ঠুর যাতাকলে পিষ্ট সাদ্দামের এই বিবর্ণ জীবন কে। সুবর্ণা ও তার নিষ্পাপ শিশুটির এমন সকরুণ মৃত্যু নষ্ট রাজনীতির সেই ঘৃণ্য রিপুগুলোর স্বরুপ উন্মোচন করে দিয়ে গেছে। শনাক্ত করে গেছে রাজনৈতিক ও সামাজিক মুখোশের আড়ালে নিস্ঠুরতার ধারালো ছিদ্রগুলো !

প্রসঙ্গত: আইনের নীতিগত[ethical] বিশেষত্ব হলো এই যে, তা কোনো অমানবিকতা কে উৎসাহিত করেনা কিংবা উস্কে দেয়না; মানুষের কল্যাণার্থেই আইনের উদ্ভব; মানুষ আইনকে সৃষ্টি করেছে, আইন মানুষকে নয়; মানুষই আইনের প্রণেতা, আইন মানুষের প্রণেতা নয়; মানুষের হিতার্থেই আইনের পরিবর্তন-পরিমার্জন-প্রয়োগ ঘটবে; বস্তুত এগুলোই আইনের দর্শনতাত্ত্বিক মূল্যবোধ ও মর্মবোধ। অথচ গভীর পরিতাপের বিষয় হলো এই যে, আমাদের সমাজে অনেক সময় আইনের শাসনের নামে আইনকে রাজনৈতিক হিংসা-প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করা হয়। অপব্যবহার করা হয় ব্যক্তির ও গোষ্ঠীর হীনস্বার্থ চরিতার্থের ক্ষেত্রে। এভাবে আইন যখন হীন উদ্দেশ্যে অপব্যহৃত বা অপচর্চিত হয় তখন আইনের শাসনের নামে আইন নিজেই শাসিত হয়ে যায়; আর তখনই বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদে ওঠে। কেঁদে ওঠে আইন। কেঁদে ওঠে মানবতা।

লেখক:  কলামিস্ট ।