
সব ধরনের শঙ্কা কাটিয়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করবে। অভিনন্দন বিজয়ী দল বিএনপিকে।
বিএনপির একটি বড় সুবিধা হচ্ছে যে তারা বাংলাদেশের বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দল, যাদের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে।
এই দলে যেমন আছেন অনেক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, তেমনি আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা, থিংকট্যাংক, পেশাদার এবং আধুনিক মনা মানুষ। ফলে এই দলের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব, যদি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারে। যা হোক, এসবই রাজনীতির বিষয়, যা আমার লেখার বিষয় নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে এসব নিয়ে আলোচনা করবেন এবং সঠিক পরামর্শ দেবেন, যা বিজয়ী দলের জন্য ভালো কাজে আসবে।
আমার আগ্রহের জায়গা হচ্ছে দেশের ব্যাংকিং খাত এবং অর্থনীতি, যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিগত দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে। আর এ কারণেই দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য হবে নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
বিগত দেড় বছরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি এবং বিনিয়োগ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতির দিকে একেবারেই দৃষ্টি দেয়নি।
দুজন অর্থনীতিবিদের ওপর অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হোক অর্থনীতি পুনরুদ্ধারএবং বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাঁরা সে রকম কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেননি। দেশের বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ সেভাবে আসেনি। উল্টো চলমান বিনিয়োগও অনেক ক্ষেত্রে স্তিমিত হয়ে গেছে। অসংখ্য উৎপাদনকেন্দ্র বা ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে।
আমদানি-রপ্তানি দুটিই হ্রাস পেয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, উল্টো অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের নামে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি কমেনি, উল্টো বিনিয়োগ ব্যাহত হয়েছে উচ্চ সুদের কারণে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থায় থাকা দেশের ব্যাংকিং খাত আকস্মিক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেওয়ায় সেখানে এক লেজে-গোবরে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর সার্বিক প্রভাব পড়েছে দেশের মোট উৎপাদন বা জিডিপির ওপর, যা একসময়ের ৬ শতাংশের ওপর থেকে ৩ শতাংশের কাছে চলে এসেছে।
দেশের অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে, তা ঠিক করে সেখানে গতি সঞ্চার করার কাজটি মোটেই সহজ নয়। অর্থনীতি একটি জটিল এবং বিস্তৃত বিষয়। তাছাড়া দেশের অর্থনীতি এখন আর ছোট নেই। অর্ধট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে অনেক আগেই, যা খুব সহজেই আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে, যদি সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়। এ রকম একটি অর্থনীতিতে যে ক্ষতি বিগত দেড় বছরে হয়েছে, তা ঠিক করতে কোথা থেকে শুরু করে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে, সেটিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা নতুন সরকারকে মোকাবেলা করতে হবে। কাজটি কঠিন, তবে মোটেও অসম্ভব নয়। কিন্তু ভেবেচিন্তে এবং পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।
কিছু বিষয় সরাসরি সামনে চলে আসবে, যার গুরুত্ব একেবারে কম নয়। প্রথমত, বিগত সরকারের আমলে গৃহীত মেগাপ্রকল্পগুলোর কী অবস্থা হবে। এসব প্রকল্প কি চালিয়ে নেওয়া হবে, নাকি বাতিল ঘোষণা করা হবে, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। তবে যে সরকারই উদ্যোগ গ্রহণ করুক না কেন, সেটি মূলত জনগণের অর্থে নির্মাণ করা হয়। তাই দেশ ও জাতির জন্য যদি ভালো হয়, তাহলে সেই প্রকল্প বাতিল না করে চালিয়ে নিতে পারলে খারাপ হবে না, যদিও প্রয়োজনীয় সমন্বয় অবশ্যই করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, নতুনভাবে মেগাপ্রকল্প বা দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে কি না। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে দুটি বিপরীতধর্মী বিষয় জড়িত। যেমন—পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহের সুযোগ থাকতে হবে, আবার অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ না করলে অর্থনীতিতে খুব সহজে গতি আসবে না। এই দুইয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় করার মাধ্যমে কাজটি করা যেতে পারে।
দেশে কার্যকর বন্ড মার্কেট স্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ছেড়ে অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। তৃতীয়ত, ডলার সংকট কতটা কেটেছে এবং কী অবস্থায় আছে, তা আমরা সঠিকভাবে জানি না। দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং সরকারের কড়াকড়ির কারণে আমদানি হ্রাস পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হলে এই রিজার্ভের পরিমাণ পর্যাপ্ত কি না, সেটি ভালোভাবে নিরূপণ করে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে। কোনো অবস্থায়ই আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে রাখার সুযোগ আর অব্যাহত রাখা ঠিক হবে না। প্রয়োজনে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে বিশেষায়িত প্রবাসী বন্ড হতে পারে একটি ভালো উৎস।
দেশের মুদ্রাবাজার, ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজার নিয়েও খুব দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন আছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে বসে আছে। ঋণের ওপর সুদহার অনেক বেশি, যা ক্ষেত্রবিশেষ ১৫ শতাংশ বা তার বেশি। এত উচ্চহারে সুদ দিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে স্বাভাবিক নিয়মে ব্যবসা করে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এ রকম একটি কঠিন আর্থিক সমস্যার মধ্যে আছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। তাই নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে ঋণের ওপর সুদহার হ্রাস করা। এ কথা ঠিক যে সুদহারের সঙ্গে অর্থনীতি ও মুদ্রানীতির অনেক বিষয় জড়িত আছে, যা বিবেচনায় নিয়েই সুদহার হ্রাসের কাজে হাত দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ মঞ্জুর প্রায় বন্ধই করে রেখেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদন করা ঋণ বিতরণ করতে ব্যাংক অপারগতা প্রকাশ করেছে। ফলে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী বিনিয়োগ এবং পরিচালনা মূলধন সংগ্রহ করতে গিয়ে মারাত্মক সমস্যায় পড়েছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যাবসা-বাণিজ্যের ওপর। তাই নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ হবে অতি দ্রুত ব্যবসায়ীদের ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদানের সুযোগ সহজ করা। এ কথা ঠিক আমাদের দেশে ব্যাংকিং খাতে অনেক সমস্যা আছে, যার সমাধান করতে হবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা রাতারাতি সমাধানের কোনো সুযোগ নেই। এসব সমস্যার সমাধান অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু সেটি হতে হবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সচল রেখে। এর পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারে গতি সঞ্চার করার উদ্যোগও গ্রহণ করতে হবে। কেননা দেশের পুঁজিবাজার সক্রিয় না থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে গতি আসবে না।
নতুন সরকারকে অর্থনীতির অনেক বিষয়ে একসঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে, যা বিস্তারিতভাবে এক লেখায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে বিভিন্ন বিষয় পৃথকভাবে বিস্তারিত তুলে ধরার ইচ্ছা আছে। এতসব বিষয় নিয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে নতুন সরকার চাইলে উচ্চ পর্যায়ের কয়েকটি কমিটি গঠন করতে পারে; যেমন—অর্থনৈতিক কমিটি, মুদ্রানীতি কমিটি, এবং ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার সংক্রান্ত কমিটি, যেখানে থাকবে দেশের প্রথিতযশা ও অভিজ্ঞ পেশাদার অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষক। এসব কমিটির সব পরামর্শ যে সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে তেমন নয়। সরকার সেসব পরামর্শ বিবেচনা করে এতটুকু অন্তত নিশ্চিত হতে পারবে যে তাদের গৃহীত পদক্ষেপ সঠিক পথে আছে। মোটকথা, নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দেশের অর্থনীতি, যেখানে খুব দ্রুত তাৎক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন আছে। নতুন সরকার এ ব্যাপারে যত শিগগির কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, তত দ্রুত দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে।
লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা
সৌজন্য: কালের কণ্ঠ