
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু শব্দ আছে, যেগুলো বিশ্লেষণের জন্য নয় বরং ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। “ভারতপন্থি” তেমনই একটি শব্দ। এটি এখন আর কোনও রাজনৈতিক অবস্থান বোঝায় না, বরং একটি রাজনৈতিক কৌশলকেই বোঝায়। যাকে দুর্বল করা দরকার, যাকে সন্দেহের মুখে ঠেলে দিতে হবে, তার গায়েই এই তকমা সেঁটে দেওয়া হয়। এতে প্রমাণের দরকার হয় না, বাস্তবতার দায়ও নেই। আবেগই এখানে সবচেয়ে বড় পুঁজি। আজ এই কৌশলটি আবার সামনে আনা হয়েছে বিএনপি ও তার চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে।
একটি অস্বস্তিকর সত্য দিয়ে শুরু করা যাক। ভারত কখনোই নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশে তার মিত্র নির্ধারণ করেনি, বরং স্বার্থের ভিত্তিতে মিত্র বেছে নিয়েছে। গত দেড় দশকে সেটি খোলাখুলিভাবেই দেখা গেছে। টানা তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়া, এসব কিছুই ভারতের সমর্থনে ফাটল ধরাতে পারেনি। সীমান্তে একের পর এক বাংলাদেশি নিহত হলেও কূটনৈতিক ভাষা নরমই ছিল। তিস্তা চুক্তি হয়নি, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন অমীমাংসিত থেকেছে, বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে- তারপরও সম্পর্ক ছিল ‘উষ্ণ’। কারণ দিল্লির কাছে সবচেয়ে জরুরি ছিল একটি অনুগত ও পূর্বানুমেয় সরকার, যে সরকার প্রশ্ন তুলবে না, দরকষাকষি করবে না এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করবে না।
এই বাস্তবতায় এ সময়ে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠে আসে, তারেক রহমান বা বিএনপি সত্যিই ভারতের পছন্দের শক্তি কিনা? অধিকাংশ রাজনীতিক বিশ্লেষকদের মতে ভারতীয় নীতিনির্ধারণী মহল ও বিশ্লেষকরা বিএনপিকে এখনও ‘অনিশ্চিত’ শক্তি হিসেবেই দেখে। তাদের দৃষ্টিতে বিএনপির ক্ষমতায় আসা মানে নতুন করে শর্ত, প্রশ্ন ও চাপের মুখোমুখি হওয়া। অর্থাৎ তারেক রহমান ভারতের জন্য কোনও নিশ্চিন্ত পছন্দ নন; তিনি বরং সেই পুরোনো আরামদায়ক রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
তারপরও তাকে “ভারতপন্থি” বলার চেষ্টা চলছে অবিরাম। এখানেই রাজনীতির দ্বিচারিতাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংলাপের কথা স্বীকার করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির একাধিক জাতীয় দৈনিকে বলেছেন, ভারতের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে আলোচনা চলছে, ভবিষ্যতে সম্পর্ক উন্নয়নে তারা আগ্রহী। এসব বক্তব্য গোপন নয়, অস্বীকৃতও নয়। কিন্তু এই সংলাপগুলোকে কেন্দ্র করে জামায়াতকে “ভারতপন্থি” আখ্যা দেওয়ার কোনও তৎপরতা দেখা যায় না। এই দ্বিচারিতাই প্রমাণ করে “ভারতপন্থি” শব্দটি কোনও নীতিগত বিশ্লেষণ নয়; এটি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক লেবেল।
আসলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী আবেগকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্যের মতো বাস্তব ক্ষোভগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটি সহজ গল্প বানানো হয়। গল্পটি খুব সরল- যে ভারতের সঙ্গে প্রশ্নহীনভাবে থাকে সে নিরাপদ, আর যে শর্ত দেয় সে সন্দেহজনক। এই সরলীকরণে ভোটের রাজনীতি চলে, কিন্তু রাষ্ট্র চলে না। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মতো ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা একটি দেশের পক্ষে ভারতের সঙ্গে কথা না বলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি শর্তহীন নীরবতা মেনে নেওয়াও আত্মঘাতী। এই জায়গাতেই তারেক রহমানের রাজনীতি পুরোনো ছক ভেঙে দেয়।
তারেক রহমান এমন একটি সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন, যখন “ভারতকে সন্তুষ্ট রাখলেই দেশ চলবে”- এই ধারণাটি নিজেই ধসে পড়েছে। ভারতকে সন্তুষ্ট রেখে বাংলাদেশ পেয়েছে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ক্ষোভ, সীমান্তে লাশ আর কাঠামোগত অর্থনৈতিক বৈষম্য। এই মডেল আর কাজ করছে না। সেটি বোঝার পরও যদি কেউ পুরোনো ভয় দেখিয়ে রাজনীতি করতে চায়, তবে সেটি সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারারই প্রমাণ।
এই লেখা কোনও দলের পক্ষের সাফাই নয়। এটি একটি বড় প্রশ্ন তোলার চেষ্টা। বাংলাদেশ কি আবার লেবেল, আবেগ আর ভয় দেখানোর রাজনীতিতে ফিরে যাবে, নাকি পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে পরিণত আলোচনায় যাবে? তারেক রহমানকে ভালো লাগুক বা না লাগুক, একটি বিষয় স্পষ্ট- তিনি পুরোনো তাঁবেদারির রাজনীতিকে আর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখছেন না। আর ঠিক এই কারণেই তাকে পুরোনো ছকে ফেলা যাচ্ছে না।
এই অস্বস্তিই আজকের রাজনীতির আসল সংকেত।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন