
গত আড়াই দশকে দেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান গোচরে বা অগোচরেই ঘটেছে। এই মতাদর্শিক ঢেউ আমাদের সমাজের ভিত্তি ক্ষয় করছে। এই উত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিসরে নয়, শিক্ষাঙ্গন, সামাজিক মাধ্যম এবং প্রবাসীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে প্রশ্ন জাগে– আমরা কি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের মতো উগ্র মতাদর্শের জোয়ারেও তলিয়ে যাব?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধা– আমরা স্থলবেষ্টিত নই, বরং দীর্ঘ উপকূল দিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সেই সুবিধাই এখন হুমকিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল না। ধর্মীয় বিবেচনায় প্রকৃতির ভাষা– সীমান্ত পেরোনো নদীর প্রবাহ উপেক্ষিত হয়েছিল। যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃদ্ধি পায়, বিশাল এলাকা পানির নিচে চলে যাবে। সীমান্ত ও সমুদ্রের মধ্যে আটকে থাকা কোটি মানুষ কোথায় যাবে? এই প্রশ্নগুলো দেশভাগের রাজনৈতিক হিসাবের অংশ ছিল না, অথচ আজ এগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।
আমাদের আশা ছিল পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত নতুন প্রজন্মের ওপর। আমরা বিশ্বাস করতাম তারা গতানুগতিক ভারতবিরোধী বক্তব্যে যুক্ত না হয়ে বরং বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। প্রতিবেশী যদি বড় ও শক্তিশালী হয়, আমাদের কৌশল হওয়া উচিত আরও দক্ষ, আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া– পাকিস্তানকে বিকল্প মিত্র ভেবে রোমাঞ্চিত হওয়া নয়। অথচ প্রবণতা হতাশাজনক। পশ্চিমা শিক্ষিতদের মধ্যেও অনেকে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, ভারতকে শিক্ষা দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে। ন্যূনতম ভূগোল ও রাজনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন দেশপ্রেমিক মানুষের পক্ষে এমন ভাবনা অকল্পনীয়। তারা উপেক্ষা করছে যে বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে– যা পাকিস্তান নিজেও স্বীকার করে। পৃথিবীতে এমন জাতি খুঁজে পাওয়া দুরূহ হবে, যেখানে একটি গোষ্ঠী বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে নিজেদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধকে এভাবে অপমান করতে পারে!
ভেবেছিলাম শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম ভারত-পাকিস্তানের বিভাজন ও হীনম্মন্যতার রাজনীতি পরিহার করে অন্তত পশ্চিমা গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তাদের অনেকেই ভূরাজনীতির হিসাবনিকাশে পশ্চিমের দিকে ঝুঁকছে, অথচ সাংস্কৃতিক প্রশ্নে পাকিস্তানপন্থাকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছে। তাদের মানসপটে যেন ভারতকে সরিয়ে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানোর এক সুপ্ত বাসনা কাজ করছে। এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য ভয়ংকর সংকেত।
গত কয়েক দশকে পশ্চিমে শিক্ষিত একটি অংশ পোশাক ও জীবনযাত্রায় আধুনিক হলেও সাংস্কৃতিক প্রশ্নে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিকেই সমর্থন দিতে চাচ্ছে। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এই গোষ্ঠীটি জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বাহ্যিক আধুনিকতা গ্রহণ করলেও সাংস্কৃতিক মননকে প্রকৃত অর্থে আধুনিক করতে পারেনি। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন উপাচার্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। আমরা কি বলতে পারি, এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় তারা অক্সফোর্ডের শিক্ষার কোনো প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন? বরং তারা যে ধর্মীয় উগ্র ডানপন্থার অনুমোদন দিচ্ছেন, তা পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় না।
অবাক হয়ে দেখি, বিদেশে থাকা অনেক বাংলাদেশি মনে করেন পাকিস্তানিরা তাদের প্রতি বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারা বোঝার চেষ্টা করেন না– পাকিস্তানিরা এখন কেন আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগতি করেছে। সেই অগ্রগতিই আমাদের এই সম্মান ও অগ্রাধিকার এনে দিয়েছে। আরও কিছু অগ্রগতি হলে ভারতও আমাদের গুরুত্ব দিতে বাধ্য হতো। শত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক পরিসরে পাকিস্তানের তুলনায় অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে। আন্তঃদেশীয় বন্ধুত্ব দানের বিষয় নয়– এটি অর্জিত হয় অগ্রগতি ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তির মাধ্যমে। আমরা যদি সেই ভাবমূর্তি ধরে রাখতে ব্যর্থ হই, অন্যান্য দেশ আমাদের স্বাগত জানাবে না।
দীর্ঘদিন পশ্চিমা দেশে থেকেও অনেকের এই উপলব্ধি হয় না– এটি আমাকে বিস্মিত করে। পশ্চিমা দেশে বসে যারা দেশের ধর্মীয় চরমপন্থাকে সমর্থন করেন, তারা বুঝতে পারেননি যে মাতৃভূমিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকার রক্ষিত না হলে, পশ্চিমা সমাজেও তারা অবিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। পশ্চিমা সামাজিক পরিসরে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কারণ শুধু সাদা-কালো চামড়ার পার্থক্য নয়; এটি মূলত জাতিগত ভাবমূর্তির প্রশ্ন। চীনের সঙ্গে পশ্চিমাদের যতই প্রতিযোগিতা বা দ্বন্দ্ব থাক, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতায় চীনারা পাকিস্তান তো বটেই, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় অনেক বেশি অগ্রগণ্য। কেন? শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য? মোটেই না। সামাজিক বিশ্বাসযোগ্যতায় সাংস্কৃতিক অগ্রগতির গুরুত্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতির চেয়েও বেশি। চীনারা জাতিগতভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা অনুমোদন করে না। এ ক্ষেত্রে নেহরুর ভারতের তুলনায় মোদির ভারতও অনেক পিছিয়ে যাচ্ছে।
আফগানিস্তানের দিকে তাকান– আমরা কি সেই ধর্মীয় চরমপন্থা চাই? আমাদের অর্থনীতি যখন প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তখন কি আমরা এমন ভাবমূর্তি বহন করতে পারি? অর্থনৈতিক সংকট কাটানো যতটা কঠিন, সাংস্কৃতিক সংকট কাটানো তার চেয়েও বেশি দুরূহ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা শুধু একটি স্বাধীন দেশ পাইনি; আমরা অর্জন করেছি একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল ভাবমূর্তি। আয়তনে ছোট একটি উন্নয়নশীল দেশের এই ভাবমূর্তির মূল্য যদি আমরা অনুধাবন করতে না পারি, তবে তা হবে আমাদের জন্য চরম দুর্ভাগ্য।
সম্প্রতি অনেকে দাবি করছেন, ইসলামী ডানপন্থি ছাত্র সংগঠন ও তাদের নেটওয়ার্ক শিক্ষায় ভালো করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো– এটি কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাপা হয়েছে? ডানপন্থি শিক্ষা বাংলাদেশে নতুন নয়। হ্যাঁ, তাদের কেউ কেউ মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পড়েছে এবং ভালো বেতনের চাকরি করছে। তবু প্রশ্ন থাকে: এই ধর্মীয় ডানপন্থি স্নাতকদের মধ্যে কতজন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে আলোকিত করেছে শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ বা কূটনীতিক হিসেবে? আমরা ক’জনের নাম বলতে পারব? নিজেদের শিক্ষার পরিবেশ ও মান ধ্বংস করে ক্যাম্পাস যুদ্ধ জেতার তাৎপর্য কী, যদি তা আন্তর্জাতিক প্রভাব না আনে? বৈশ্বিক দক্ষতা ছাড়া জাতীয়তাবাদ একটি ফাঁপা বুলিমাত্র– দেশে করতালি পেলেও বিদেশে আমাদের শক্তিও গুরুত্বহীন করে তোলে।
ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আমাদের বিরাজমান সমস্যার সমাধান হবে– এই বিশ্বাস মারাত্মক ভুল। ভারতের সঙ্গে কোনো সমস্যা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে কখনও সমাধান হবে না। এই মানসিকতা শুধু আত্মঘাতী নয়, এটি গভীরভাবে বিভ্রান্তিকর ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি অপমানজনক। আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করা উচিত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে, সে জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের তরুণদের একটি বড় অংশ এই সত্যটি ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাদের ভুল অগ্রাধিকার আমাদের হতাশ করে।
ধর্মীয় চরমপন্থার এমন উত্থান, আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ অন্ধকার ভবিষ্যতের কথাই বলে। তবে ধর্মীয় চরমপন্থার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ আছে– থাকা উচিত। আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি করেছি, তা পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক মানের করতে না পারলে এই ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
আলতাফ রাসেল: পিএইচডি গবেষক, অর্থনীতি বিভাগ, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
[email protected]
সূত্র: সমকাল