মানিকগঞ্জের চরাঞ্চলে পদ্মার ভাঙন, রক্ষা পেল না পূর্বপুরুষের কবর

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮

‘বাড়িঘর, জমিজমার সঙ্গে এবার আমাদের পূর্বপুরুষের কবরটিও পদ্মা নদীর পেটে চলে গেল’ -আক্ষেপ করে বলছিলেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া এলাকার কবির মোল্লার ছেলে জীবন মোল্লা।
পদ্মার তীব্র ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমির পাশাপাশি এবার বিলীন হয়েছে তার দাদা মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবরও। দেড় যুগ ধরে যে কবরটি তার বাবা ও চাচার কাছে ছিল স্মৃতি ও আবেগের জায়গা, নদীভাঙনে সেটিও এখন আর নেই।
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে কয়েক বছর ধরে পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। চার-পাঁচ বছর ধরে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দুই হাজারের মতো বসতবাড়ি, হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি।
স্থানীয়দের দাবি, হরিহরদিয়া, সেলিমপুর, জয়পুর ও হালুয়াঘাটসহ আশপাশের এলাকায় চলতি বছরই শতাধিক বাড়িঘর পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছে।
এছাড়া গত চার-পাঁচ বছরে বিলীন হয়েছে চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ, সুতালড়ি ও আজিমনগর ইউনিয়নে আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের চারতলা ভবন, হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কয়েকটি স্কুল ও বাজারসহ বহু বাড়িঘর।
নদীভাঙনে শুধু বসতভিটা কিংবা ফসলি জমিই হারাচ্ছেন না চরাঞ্চলের মানুষ; হারাচ্ছেন তাদের স্মৃতি, স্বজনের কবর এবং দীর্ঘদিনের বসতি।
প্রশাসন বলছে, নদীভাঙনের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। শিগগিরই ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। পানি উন্নয়ন বিভাগও এলাকা পরিদর্শন করে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছে
হরিহরদিয়া এলাকার হরিহরদিয়া কিন্ডারগার্টেনের মালিক রাজিব হোসেন বলেন, “সেলিমপুর গত বছর শেষ করেছে পদ্মা। এবার বর্ষায় জয়পুরে ১৫০টির মতো বাড়ি নদীতে চলে গেছে। মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছেন।
“যারা আগে জমিজমার মালিক ছিলেন, এখন তাদের অনেকেরই থাকার জায়গা নেই। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের পাশাপাশি ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নেও ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে।”
হালুয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেনের ঘরবাড়ি ও জমি কয়েক বছর আগেই পদ্মায় বিলীন হয়েছে।
তিনি বলছিলেন, “এখন আবার হালুয়াঘাট এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। হড়িনাঘাট এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।” চরাঞ্চলে পদ্মার ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ তার।
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য মোতালেব হোসেন।
তিনি বলেন, “দ্রুত বস্তা ফেলা না হলে চর থাকবে না। আফরোজা খানম রিতা বিমানমন্ত্রী থাকাকালে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের সেলিমপুর-হরিহরদিয়া এলাকায় ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও এ বিষয়ে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি বলে শুনেছি।”
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলছেন, চরের মানুষ অসহায়। তার ইউনিয়নের চরাঞ্চল পদ্মার ভাঙনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন আর তেমন কিছুই নেই।


স্থানীয় এ জনপ্রতিনিধির অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নটাখোলা পুলিশ ফাঁড়ি ও নটাখোলা আফরোজা উচ্চ বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
আন্ধারমানিক ঘাট থেকে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে চলাচলকারী ট্রলারের চালক ফরিদ হোসেন বলছিলেন, “সেলিমপুর গত বর্ষায় শেষ, এ বর্ষায় জয়পুরও শেষের পথে; হালুয়াঘাটেও ভাঙছে। হরিনা ঘাট, আজিমনগর ইউনিয়নেও ভাঙতেছে। এভাবে ভাঙতে থাকলে চর আর থাকবে না; সব পদ্মার পেটে চলে যাবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরাঞ্চলে কয়েক বছর ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইএনও) ফারজানা আক্তার বলেন, “আমি এক সপ্তাহ হলো, এ উপজেলায় যোগদান করেছি।
“লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নদীভাঙনের বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাব।”
জেলা পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, “সোমবার মানিকগঞ্জ-২ আসনের এমপি মঈনুল ইসলাম খান ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে ভাঙন কবলিত এলাকা ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে যাচ্ছি। পরিদর্শন শেষে বিস্তারিত আপনাকে জানাতে পারবো।”