
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মুখে টেপ মারা অবস্থায় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলছে, তার কাছে থাকা ‘টাকা লুটে নিতেই’ যাত্রীকে মেরে ফেলে গিয়েছিল বাসের চালক ও দুই সহকারী।
পুলিশের ভাষ্য, ইসমাইল হোসেন নামে ওই যাত্রী জামালপুর থেকে গাজীপুরে আসার জন্য বাসে উঠেছিলেন; মাঝপথে ভাড়া দেওয়ার সময় তার কাছে মোটা অংকের টাকা থাকার বিষয়টি টের পেয়ে গিয়েছিল বাসটির সুপারভাইজার।
ঘটনার পরদিন শনিবার রাতে 'রাজ ক্লাসিক' নামের ওই বাসটি শনাক্তের পর জব্দ করে পুলিশ। এরপর গ্রেপ্তার করা হয় বাসের চালক সোহেল রানা, সুপারভাইজর সাজু ওরফে মিলন এবং বাসের সহকারী মনির হোসেনকে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে শুক্রবার সকালে নাম না জানা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন মরদেহের মুখে টেপ মারা ছিল, পরনে ছিল অটোরিকশা চালকদের ইউনিফর্মের মত নীল রঙের শার্ট আর লুঙ্গি।
তার আঙুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে শনিবার পুলিশ জানতে পারে, ৫০ বছর বয়সি ওই ব্যক্তির নাম ইসমাইল হোসেন। তিনি জামালপুর সদর উপজেলার জালাল উদ্দিনের ছেলে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার লাশ শনাক্ত করে ইসমাইলের ছেলে হাসান।
পরিবারের তরফ থেকে বলা হয়, মেয়ের বিয়ের জন্য জমি বিক্রির ৫ লাখ টাকা নিয়ে গ্রামের বাড়ি জামালপুর থেকে গাজীপুরে ফিরছিলেন ইসমাইল। সেই টাকা এবং সঙ্গে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ‘খোয়া গেছে’ বলে জানায় তার পরিবারের সদস্যরা।
এদিন রাতেই মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বাসটি জব্দসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ঘটনার 'রহস্য উদঘাটনের' কথা জানায় পুলিশ।
মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে জানাতে সংবাদ সম্মেলনে এসে রোববার ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, এক্সপ্রেসওয়ে থেকে উদ্ধার হওয়ার লাশের মুখে এবং দুই হাতে টেপ প্যাঁচানো ছিল এবং গলায় কালো দাগ দেখা ছিল।
ওই ব্যক্তিকে হত্যা করে গাড়িতে করে ফেলে দেওয়া হয়েছে ধারণা করে তদন্তে নামে পুলিশ।
এক্সপ্রেসওয়ের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও পর্যালোচনার কথা জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক বলেন, “একটি বাসের গতিবিধি সন্দেহ হলে আমরা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করি।”
গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তিনি বলেন, "হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।"
ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জামালপুর থেকে বাসটিতে উঠেছিলেন ইসমাইল।
"বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ওঠানামা করে জামালপুর থেকে ঢাকা আসার পথে এক পর্যায়ে সুপারভাইজার সাজু ইসমাইলের কাছ থেকে ভাড়া চান। ইসমাইল লুঙ্গিতে গুজে রাখা টাকা বের করে ভাড়া দিয়েছিলেন। তখন তার কাছে বেশি পরিমাণ টাকা থাকার বিষয়টি খেয়াল করে সাজু।
"পরবর্তীতে বাস চালককে বিষয়টি অবহিত করে যে, এই ব্যক্তির কাছে অনেক টাকা আছে। সে কোনো বেপারী হতে পারে, সুতরাং তার কাছে আরো টাকা পাওয়া যেতে পারে ধারণা করে তারা। পরে বাস যে চালক তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করে।"
সে অনুযায়ী বাসটি চন্দ্রা বাস স্ট্যান্ডে ইসমাইলকে না নামিয়ে বাসের অন্যান্য যাত্রীদের গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে নামিয়ে দেয়। ইসমাইলকে নিয়ে বাসটি ঢাকার দিকে আসতে থাকে।
"এক পর্যায়ে সুপারভাইজার এবং হেল্পার মিলে ইসমাইলের মুখ এবং হাত টেপ দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং গামচা পেঁচিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।"
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. ফারুক আরো বলেন, "এয়ারপোর্ট থেকে এক্সপ্রেসওয়ে ধরেই বনানীতে আসে বাসটি। আবার তারা উল্টো পথে আবার এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়ার পথে পিলার নম্বর ১৭৯ এবং ১৮০ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি জায়গায় ইসমাইলের লাশ ফেলে চলে যায়।"
পরবর্তীতে তথ্য প্রযুক্তির এবং ‘অন্যান্য সোর্সের সহায়তায়’ বাসটি জব্দসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলেন যুগ্মকমিশনার ফারুক।
তিনি বলেন, “মামলায় ইসমাইলের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা লুটের কথা বলা হলেও গ্রেপ্তাররা দাবি করেছে, তারা আড়াই লাখ টাকা নিয়েছে। তারা টাকা খরচ করে ফেলেছে বলে দাবি করেছে। আমরা তাদেরকে রিমান্ডে এনে ব্যপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে টাকাটা কোথায় আছে জনতে পারব।"
ক্যামেরা থাকার পরেও বাসটি শনাক্ত করতে দেরি হওয়া এবং এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "এক্সপ্রেসওয়েরতো আলাদা কর্তৃপক্ষ রয়েছে। আমরা সবসময় বলে থাকি যে, এই এক্সপ্রেসওয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। তো এটার নিরাপত্তা যেহেতু তারাই বিধান করে থাকে। আমরা আমাদের তরফ থেকে সবসময় বলে এসছি যে, এটির নিরাপত্তা বিধান করা। বিশেষ করে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে এটি নিরাপদ করা।"
সিসিটিভি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোন ব্যত্যয় আছে কি না বা কর্তৃপক্ষের যে শর্ত ছিল সেটি তারা পরিপালন করছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।