
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এই সম্পর্ক। ছাত্র-জনতার প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার প্রায় আড়াই বছর পর, আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারতীয় ও বিদেশি সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক অনলাইন বার্তায় তিনি এ কথা জানান। দেশে ফিরলে কারাবরণ বা মৃত্যুদণ্ডের মতো পরিণতি হতে পারে—এমন শঙ্কা সত্ত্বেও দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করার তাগিদ থেকেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে ঢাকা বলেছে, এই ধরনের আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে আগে থেকেই ভারত সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই উন্মুক্ত আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীরভাবে হতাশ।
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনেই এমন আয়োজনকে ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা’ বলে আখ্যায়িত করেছে ঢাকা।
যদিও শেখ হাসিনার এই অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের আগেই ভারত বিষয়টি থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল। তাদের দাবি, ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ায় আয়োজিত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওই সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তারা এর অনুমোদনও দেয়নি। তবে ভারতের এই ব্যাখ্যা ঢাকাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
পটভূমি ও ভারতের অস্বস্তি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে চরম শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন শেখ হাসিনা। ওই রক্তক্ষয়ী ধরপাকড়ে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর থেকেই তাকে ভারতের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর এই ক্ষোভ আরও বাড়ে।
ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনার বিভিন্ন বিবৃতি ও সাক্ষাৎকার দেওয়ার ঘটনায় ঢাকা বারবার নয়াদিল্লিকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি বিচারের মুখোমুখি করতে তাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার (প্রত্যর্পণ) দাবিও জানিয়েছে ঢাকা। তবে ভারত এখন পর্যন্ত ঢাকার এসব অনুরোধ এড়িয়ে গেছে।
নয়াদিল্লি মনে করে জোর করে হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ভারতের জন্য কোনো বিকল্প নয়। তবে তার স্বেচ্ছায় ফেরার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করতে পারে। গুঞ্জন রয়েছে, দেশে ফেরার পর হাসিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে পর্দার আড়ালে কাজ করছে ভারত। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বেশ উষ্ণ ছিল। তবে তার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চীনের দিকে ঝুঁকে পড়লে এবং ভারতের উদ্বেগের প্রতি উদাসীনতা দেখালে সেই সম্পর্কে ভাটা পড়ে। অতীতে দিল্লিতে বিএনপিকে ‘ভারতবিরোধী’ মনে করা হলেও, গত ফেব্রুয়ারিতে দলটি ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক নতুন করে ঢেলে সাজানোর আশা জেগেছিল। এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নয়াদিল্লি সফরকে আস্থা ফেরানোর উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হয়েছিল। তারপরও পাকিস্তান, চীন ও তুরস্কের সঙ্গে বিএনপি সরকারের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতায় ভারত এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
৪ হাজার ১০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভূবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ওই অঞ্চলের বিদ্রোহ দমনে ঢাকার সহযোগিতা নয়াদিল্লির জন্য অপরিহার্য।
এসব সমীকরণের কারণেই সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি ও লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে পাঠানো হয়।
জ্বালানি সংকটের মধ্যে ২০২৬ সালের এপ্রিলে ৪৫ হাজার টন ডিজেল পাঠায় ভারত। সম্পর্ক মেরামতের লক্ষ্যে ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দিনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দেওয়া হয়, এমনকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার সহজগম্যতা নিশ্চিত করতে তাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত, যদিও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এখনো সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি।
গঙ্গা, তিস্তা ও ভবিষ্যতের রূপরেখা
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হতে পারে। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। নদীর বর্তমান পানিপ্রবাহ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রেখে চুক্তিটি নবায়ন করতে হবে। চুক্তিটি দ্রুত নবায়ন হলে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক আরও মজবুত হতে পারে।
বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রে এবং পশ্চিমবঙ্গ—উভয় জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রেও ভারত ও বাংলাদেশ আগের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, যা ঢাকার দীর্ঘদিনের দাবি। এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন।
ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের উচিত পার্লামেন্টারি কমিটি অন এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স-এর সুপারিশগুলোও আমলে নেওয়া। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ওই কমিটি সরকারকে উন্নয়ন সহযোগিতায় নিজেদের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বাস অর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে ভারতের অবস্থান সুদৃঢ় হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর সম্প্রসারণ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ‘চীনের ক্রমবর্ধমান পদচারণা’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল কমিটি।