
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করার প্রায় দুই বছরের মাথায় বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা চালু করতে যাচ্ছে ভারত। ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নিয়েই ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের তরফ থেকে এই ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে বেইজিং সফর করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভারত শুধু ভিসা চালুর ঘোষণাই দেয়নি, হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। এ ছাড়া, ভারত থেকে জোর করে মানুষজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া নিয়ে সীমান্তে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের কথাও এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুপ্রবেশকারীর তকমা দিয়ে মানুষজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া, দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে হেনস্তা এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব ছাড়াও দুই দেশের নিজস্ব স্বার্থের ধারণার মধ্যে তফাত থাকায় সম্পর্ক কিছুটা থমকে গেছে।
এমন অবস্থায় সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের এগিয়ে আসা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মত দিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিকরা। সরকারেরে বর্তমান কূটনীতিকদের কেউ কেউ বলছেন, ভারত ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। আবার কারও কারও মত এর বিপরীতে।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন থেকে ভারতীয় ভিসা স্বাভাবিক করার অনুরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু ভারত সরকার কালক্ষেপণ করেছে। তারা এমন সময়ে ভিসা খোলার ঘোষণা দিয়েছে যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে রয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামও দেশে নেই। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বেড়েছে বাংলাদেশের। প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার কথা আসছে, চীন থেকে যুদ্ধবিমান কেনাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কারণে হয়তো তড়িঘড়ি করে ভিসা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ভারত।
সাবেক কূটনীতিকরা বলছেন, ভিসা চালুর মাধ্যমে হয়তো রাজনীতিক থেকে কূটনীতিক বনে যাওয়া ত্রিবেদীর বাংলাদেশ যাত্রা ইতিবাচক বার্তা দিয়ে শুরু করতে চাইছে ভারত। আর ভারতীয় দূতের মন্ত্রীর মর্যাদার বিষয়টি হয়তো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতেই করেছেন নরেন্দ্র মোদির সরকার।
ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরের সাবেক এমপি ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে গত এপ্রিলে বাংলাদেশের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৫ জুন তিনি বাংলাদেশে আসেন। বৃহস্পতিবার (২৫ মে) তিনি ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তার পরিচয়পত্র পেশ করেছেন।
পরিচয়পত্র পেশ করার পর তিনি রাজধানীতে যমুনা ফিউচার পার্কে ভারতীয় ভিসা সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা চালুর ঘোষণা দেন। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ২৮ জুন থেকেই বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার অংশ হিসেবে এই ভিসা আবার চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
তিনি জানান, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনার ভিসা সেন্টার থেকে একযোগে ভিসার কার্যক্রম শুরু হবে।
হাইকমিশনার আরও বলেন, আমি যখন বাংলাদেশে বেনাপোল হয়ে আসছিলাম, তখনই ভিসার প্রশ্নটি উঠেছিল। ভিসা খুব জরুরি একটি বিষয়। তাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় ভিসা সেন্টারে ট্যুরিস্ট ভিসা চালু নিয়ে ব্রিফিংয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী | ছবি– সংগৃহীত
সাবেক এক রাষ্ট্রদূত বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে তিক্ততা ছিল, তা পেছনে ফেলে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রদূত করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। হয়তো ভারত সরকার চাইছিল, হাইকমিশনার একটি ইতিবাচক যাত্রা দিয়ে তার মিশন শুরু করুক। হাইকমিশনারকে মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া মানে এই নয় যে বাংলাদেশ তাকে আলাদা খাতির করবে। বিগত সময়ে বাংলাদেশ সরকারও কয়েকজন রাষ্ট্রদূতকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিল, এরজন্য তারা বাংলাদেশ থেকে বাড়তি কোনো সুবিধা পেয়েছেন বিষয়টা কিন্তু এমন নয়।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশের জন্য যেমন ভারত গুরত্বপূর্ণ, আবার ভারতের জন্যও বাংলাদেশ গুরত্বপূর্ণ। বর্তমান হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত যোগাযোগের জন্য হয়তো ত্রিবেদীকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আমলাতান্ত্রিক দেয়ালটা সরিয়ে ভারত হয়তো চাইছে বাংলাদেশ ইস্যুতে হাইকমিশনার যেন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ রাখে ভারত। প্রায় দুই বছরের মাথায় পর্যটন ভিসা চালু হতে যাচ্ছে। ২৮ জুন (রোববার) থেকে বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে।
এদিকে, ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে দেশটির সরকার। বুধবার (২৪ জুন) ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক দাপ্তরিক আদেশে বলা হয়েছে, দীনেশ ত্রিবেদীকে দেওয়া কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বা প্রটোকল-সংশ্লিষ্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে নামে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে বিএনপির নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা যখন জোরালো হয়ে উঠছিল, ভারত তখন বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে শোকবার্তা পাঠিয়ে পাশে থাকার বার্তা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
নির্বাচনে জিতে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করলে তারেক রহমানের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসেন ভারতের স্পিকার ওম বিড়লা। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে ওম বিড়লা সুবিধাজনক সময়ে ভারত সফরের জন্য নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিয়েছিলেন তারেক রহমানের হাতে। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রীকে প্রথম বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ।
তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরে কোন দেশে যাবেন, তা নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। ভারতের চাওয়া ছিল, প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফর করুক। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে দেশের একটি অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব প্রবল। এ অবস্থায় তারেক রহমান প্রথম সফরের জন্য ভারতকে বেছে নিলে অবধারিতভাবে সমালোচনা হতো। বিরোধীদল এর ফায়দা নিত, বেকায়দায় পড়তো সরকার।
সেই বিবেচনায় হয়তো সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া সফর করেন তারেক রহমান। মালয়েশিয়া থেকে চীন সফরে যান তিনি। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এ সফরে নজর রেখেছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ আরও কিছু বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র। ভারতের এ সফরে নজর রাখার কারণ হিসেবে যেসব বিষয় সামনে এসেছে তার মধ্যে একটি ‘তিস্তা বহুমুখী প্রকল্প’।
গত মে মাসে দিল্লি সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে নয়াদিল্লিতে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটস্ট্র্যাটে’র কনভেনর ও বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ বলেছিলেন, বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতায় তিস্তা নদীতে একটি ব্যারাজ নির্মাণ করতে চায়। এটি বাংলাদেশের পছন্দের বিষয়। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। এ ব্যাপারে ভারত কোনোভাবেই বাংলাদেশকে থামাতে পারে না। ভারত শুধু বলতে পারে, এটি আমাদের উদ্বেগের বিষয়। কারণ, এটি বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদী।
এদিকে, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইং। বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয় বলে জানিয়েছে সরকার।