ইরান যুদ্ধে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ?

আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৯ মে ২০২৬, ১১:২৫

ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের কাছে নতুন সহায়তা কর্মসূচির আবেদন করেছে বাংলাদেশ।
আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনার মঙ্গলবার এই তথ্য জানান। তিনি বলেছেন, ‘আইএমএফ কর্মীরা কর্তৃপক্ষের সংস্কার পরিকল্পনা ও নীতি অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করছেন।’ 
তিনি আরও বলেছেন, ‘টেকসই সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে, সহনশীলতা বাড়াতে এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সমর্থনে বাংলাদেশের পাশে থাকতে আইএমএফ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
সহায়তার পরিমাণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে মার্চ মাসে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি সংকট:
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। তেলের দাম এখন প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে উঠেছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল প্রায় ৬৬ ডলার। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হওা হরমুজ প্রণালি এখনো ইরানের নিয়ন্ত্রণে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ দিয়ে রেখেছে।
১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯৫ শতাংশই আমদানি করে। এর বেশিরভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। গরমের মৌসুমে এই চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
সংকট সামলাতে সরকার সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। ১৯ এপ্রিল জ্বালানির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। পেট্রোলের দাম লিটারে ০.৯৫ ডলার থেকে বেড়ে ১.১০ ডলার হয়েছে। ডিজেল ও কেরোসিনের দামও বেড়েছে।

পোশাক শিল্পে ধাক্কা:
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। এই খাতও সংকটে পড়েছে। পোশাক কারখানাগুলো কাঁচামালের বড় অংশ চীন থেকে আনে, যা লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের পথে আসে। সেই পথে এখন সমুদ্র পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে গেছে।
কাপড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ডেনিমের পরিচালক সাইদ আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশের পত্রিকা দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেছেন, আগামী মৌসুমে কাজের অর্ডার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমে যেতে পারে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চে বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন ফ্লাইট বাতিল করে। এতে বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরে জারা'র মালিক ইনডিটেক্সসহ বড় পোশাক খুচরা বিক্রেতাদের জন্য পাঠানো পোশাকের চালান আটকে যায়।

কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি:
সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নের কারণে অন্যান্য শিল্পেও প্রভাব পড়েছে। প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামালের দামও বেড়েছে। ক্রুড অয়েলের দাম বাড়ায় রেজিনের দামও বেড়েছে। রেজিনের দাম আগে ছিল প্রতি টনে ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলার, এখন তা ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ ডলারে পৌঁছে গেছে।

বাড়ছে বিদেশি ঋণ:
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ বাড়ছে। অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ ও ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঠিক রাখতে সরকার বেশি ঋণ নিয়েছে। ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১,১৩৫ কোটি ডলারে, আগের প্রান্তিকে যা ছিল ১,১২২ কোটি ডলার।

আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক:
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া ৫৭০ কোটি ডলারের একটি আইএমএফ কর্মসূচির মাঝে আছে, যা চার বছর ধরে চলার কথা। গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠকে দ্রুত নতুন কর্মসূচি চালু করতে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে।

বৈশ্বিক ঋণ সংকট:
আইএমএফ এপ্রিলে সতর্ক করেছে, ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর বিশ্বের মোট সরকারি ঋণ বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই হবে সর্বোচ্চ।