
১০ বছর আগে যখন এরিন ক্ল্যাট ওয়ার্কিং হলিডে ভিসা নিয়ে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তার ছয় মাসের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিলেন এই দেশকেই তিনি নিজের স্থায়ী ঠিকানা বানাতে চান। ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নানা কারণে ২০১৬ সালেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছিলেন ‘ভিন্ন কোনো পরিবেশে’ বাঁচার আশায়।
এক দশক পর, ৩৪ বছর বয়সি এরিন আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট নাগরিকত্ব ত্যাগের সরকারি ফি প্রায় ৮০ শতাংশ কমানোর ঠিক আগমুহূর্তে, এরিন ২,৩৫০ মার্কিন ডলার পরিশোধ করে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগের শপথ নেন। ২০১৫ সালের মে মাসে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ এবং বিদেশে বসবাসকারী মার্কিন নাগরিকদের ওপর করের বোঝা—এই দুই কারণেই নাগরিকত্ব ত্যাগ করাকে তার কাছে সবচেয়ে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে।
এরিনের মতো এমন হাজারো আমেরিকান প্রতি বছর তাদের নাগরিকত্ব ত্যাগ করছেন। যদিও মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে এর সঠিক বার্ষিক পরিসংখ্যান পাওয়া বেশ কঠিন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও আইআরএস এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বার্ষিক সংকলন প্রকাশ করে না।
‘আমেরিকানস ওভারসিজ’ নামক একটি সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৪,৮৮৯ জন আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, যা ২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ। সংস্থাটি ধারণা করছে, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৪০,০০০ দ্বৈত নাগরিকত্বধারী আমেরিকান নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া বা এই সংক্রান্ত তথ্যের জন্য সংস্থাটির পরামর্শ নিচ্ছেন।
আমেরিকানদের নাগরিকত্ব ত্যাগের এই হিড়িকের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে মার্কিন কর আইন। ‘ফ্যাক্টকা’ নামক এই আইনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট তার নাগরিকদের বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অর্জিত আয়ের ওপর কর আরোপ এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দেয়। বিশ্বের মাত্র দুটি দেশের মধ্যে এই নিয়ম রয়েছে, যার একটি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যটি পূর্ব আফ্রিকার ইরিত্রিয়া। এই আইনের কারণে ইউরোপের ব্যাংকগুলো অনেক সময় মার্কিন নাগরিকদের অ্যাকাউন্ট খুলতে বা ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যা প্রবাসীদের সাধারণ জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। বিশেষ করে যারা ‘অ্যাক্সিডেন্টাল আমেরিকান’ বা দুর্ঘটনাবশত আমেরিকান (যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও কখনো সেখানে থাকেননি বা কাজ করেননি), তাদের জন্য এই করের বোঝা মেটানো এক দুঃস্বপ্নের মতো।
আর্থিক ও রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও অনেকের ক্ষেত্রে নিজস্ব পরিচয়ের দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। ইতালিতে বসবাসরত ক্যারোলিন চিরিচেলার কথাই ধরা যাক। তিনি নিজেকে একজন গর্বিত আমেরিকান মনে করলেও বর্তমানে তার মার্কিন নাগরিকত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। তার সন্তান ও স্বামী ইতালীয় এবং তার পুরো জীবন এখন ইতালিতেই আবর্তিত।
ক্যারোলিনের মতে, দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তিনি নিজেকে পুরোপুরি ইতালীয় বা পুরোপুরি আমেরিকান কোনোটিই ভাবতে পারেন না। এই দোলাচল থেকে মুক্তি পেতেই তিনি কেবল ইতালির পাসপোর্টটি রাখার কথা ভাবছেন।
তবে মার্কিন নাগরিকত্ব ত্যাগ করার প্রক্রিয়াটি মোটেও সহজ নয়। অন্য কোনো দেশের বৈধ নাগরিকত্ব না থাকলে কেউ মার্কিন নাগরিকত্ব ছাড়তে পারেন না। এছাড়া বিগত পাঁচ বছরের ট্যাক্স রিটার্ন ফাইল করা এবং সম্পদ মূল্যায়নের মতো দীর্ঘ ও জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। নিউ ইয়র্কের অভিবাসন আইনজীবী ব্র্যাড বার্নস্টাইন সতর্ক করে বলেন, অনেকেই সাময়িক ক্ষোভ বা ক্ষুদ্র আর্থিক সুবিধার কথা চিন্তা করে নাগরিকত্ব ত্যাগের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন, যা পরে অনুশোচনার কারণ হতে পারে। কারণ একবার নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে যাওয়ার জন্যও ভিসার আবেদন করতে হবে, যার কোনো গ্যারান্টি থাকে না।
তবুও ফি কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই এখন দ্রুত এই প্রক্রিয়া শেষ করতে চাচ্ছেন। মিসৌরি থেকে এসে সিসিলিতে বসবাস করা ৫৩ বছর বয়সি জেনিফার সনট্যাগ জানান, ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়াটাই ছিল তার জন্য দেশ ছাড়ার মূল কারণ। এখন মার্কিন কর ব্যবস্থা থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে তিনি নাগরিকত্ব ছাড়ার কাগজপত্রের অডিট করাচ্ছেন। এই সিদ্ধান্ত তার জন্য স্বস্তির হলেও কিছুটা দুঃখের, কারণ আমেরিকান পরিচয়টি তার সত্তারই একটি অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকত্ব ত্যাগের এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক বা আর্থিক বিষয় নয়, এটি মানুষের মানসিক ও সামাজিক পরিচয় পুনর্গঠনের একটি বড় অংশ।
সূত্র: সিএনএন।