
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। রক্ষণশীল নীতিনির্ধারক ও অভিবাসন সংস্কারপন্থীরা দাবি করছেন, বর্তমান ব্যবস্থায় জাতীয় স্বার্থের চেয়ে পারিবারিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, ফলে দেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের মতে, এখন সময় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিকে পরিবারভিত্তিক কাঠামো থেকে সরিয়ে শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অবদানের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি “মেরিটভিত্তিক” বা যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করার।
বর্তমান মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯৬৫ সালের অভিবাসন আইনের মাধ্যমে। সেই আইনের ফলে অভিবাসনের ক্ষেত্রে পারিবারিক পুনর্মিলনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর ফলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রিন কার্ড পান যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আত্মীয়-স্বজনের স্পন্সরশিপের মাধ্যমে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীর শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান কিংবা অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হয়ে পড়ে।
অভিবাসন সংস্কারের সমর্থকরা বলছেন, একটি দেশের অভিবাসন নীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তাদের মতে, পরিবারকে একত্রে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রত্যেক অভিবাসীর বিস্তৃত পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়।
তারা আরও দাবি করেন, বর্তমানে চালু থাকা কিছু কর্মসূচি এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে ডাইভার্সিটি ভিসা লটারির সমালোচনা করে বলা হচ্ছে, প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ শুধুমাত্র ভাগ্যের ভিত্তিতে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পান, যেখানে আবেদনকারীর দক্ষতা বা অর্থনৈতিক অবদান রাখার সক্ষমতা মূল্যায়নের কোনো বাধ্যতামূলক মানদণ্ড নেই।
অভিবাসন নীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসীদের বড় একটি অংশকে নির্বাচন করা হয়েছে দক্ষতা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার পরিবর্তে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে। ফলে শ্রমবাজারে নিম্নদক্ষ কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারি সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
তবে এই যুক্তির বিপরীতে অনেক অর্থনীতিবিদ ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, পরিবারভিত্তিক অভিবাসনই যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা উল্লেখ করেন, বহু সফল ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং উদ্যোক্তা প্রথমে পরিবারভিত্তিক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তবুও মেরিটভিত্তিক অভিবাসনের পক্ষে আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। এই ব্যবস্থার আওতায় আবেদনকারীদের শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞান, বয়স এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অবদানের ভিত্তিতে পয়েন্ট দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ পয়েন্টপ্রাপ্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অভিবাসনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
এই ধরনের পয়েন্টভিত্তিক ব্যবস্থা বর্তমানে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে সফলভাবে চালু রয়েছে। এসব দেশের সরকার দাবি করে, এর ফলে তারা শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদকালেই মেরিটভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, একটি আধুনিক অর্থনীতির জন্য উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ এবং কর্মক্ষম অভিবাসী প্রয়োজন, যারা দ্রুত শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে কর প্রদান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারবেন।
প্রস্তাবিত সংস্কারের আওতায় আরও কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিম্নদক্ষ অভিবাসন সীমিত করা, ইংরেজি ভাষাজ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আমেরিকান মূল্যবোধ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার প্রদান এবং বিদেশি শ্রমিকের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মীদের প্রতিস্থাপনের সুযোগ কমানো।
একই সঙ্গে আশ্রয়, শরণার্থী এবং অস্থায়ী সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোর সংস্কারের দাবিও উঠেছে। সমর্থকদের মতে, মানবিক সহায়তা কর্মসূচিগুলো সত্যিকার অর্থে নির্যাতিত ও ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষিত থাকা উচিত এবং অর্থনৈতিক কারণে অভিবাসনের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে মানুষকে মূল্যায়ন করা যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অভিবাসন ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি তার বৈচিত্র্য, মানবিক মূল্যবোধ এবং পরিবারভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই নিহিত।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে দক্ষতা ও অর্থনৈতিক অবদানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি, অন্যদিকে রয়েছে পরিবার পুনর্মিলন ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বান। কংগ্রেস যদি ভবিষ্যতে অভিবাসন সংস্কার নিয়ে কোনো বড় পদক্ষেপ নেয়, তবে সেই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকবে একটি মৌলিক প্রশ্ন- আমেরিকা কি অভিবাসীদের জন্য সুযোগের দেশ হিসেবে থাকবে, নাকি জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন ধরনের যোগ্যতাভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা, শ্রমবাজার, অর্থনীতি এবং অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।