
আমেরিকার সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর কোনটি? নিউইয়র্ক? লস অ্যাঞ্জেলেস? শিকাগো? অবাক করার মতো উত্তর হলো — এর কোনোটিই নয়। ইন্ডিয়ানাপলিস থেকে মাত্র বিশ মাইল উত্তরে অবস্থিত ছোট্ট শহর কার্মেল। ইন্ডিয়ানা এবার ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্টের ২০২৬-২০২৭ সালের "আমেরিকার সেরা ২৫০ বাসস্থান" তালিকায় শীর্ষস্থান অধিকার করেছে। গত বছর দ্বিতীয় স্থানে থাকা এই শহর এবার লাফ দিয়ে উঠে এসেছে একেবারে এক নম্বরে।
ইতিহাসে এই প্রথমবার দুটি পাশাপাশি শহর এই তালিকার এক ও দুই নম্বর স্থান দখল করেছে। কার্মেলের পরই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তার প্রতিবেশী শহর ফিশার্স, ইন্ডিয়ানা। দুটি শহরই ইন্ডিয়ানাপলিসের শহরতলি এবং পাশাপাশি অবস্থিত। এই দুই শহরের পাশাপাশি একই হ্যামিলটন কাউন্টির আরেকটি শহর নোবেলসভিল এই তালিকায় ১৮তম স্থান পেয়েছে।
৮৫৯টি শহরের মধ্যে মূল্যায়ন করে কার্মেল জীবনমানে ১৫তম, কর্মবাজারে ৪০তম, আকর্ষণীয়তায় ৯০তম এবং মূল্যমানে ১১৪তম স্থান পেয়েছে। সব মিলিয়ে সামগ্রিক স্কোরে কার্মেল সবার উপরে উঠে এসেছে। শহরটির জনসংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ৭৬৮ জন, গড় যাতায়াত সময় মাত্র ২১ মিনিট, মাঝারি বাড়ির মূল্য ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬২৫ ডলার, মাসিক ভাড়া গড়ে ১ হাজার ৪৫৭ ডলার এবং পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬১৫ ডলার।
কার্মেলের বাসিন্দারা এই শহরকে বর্ণনা করেন বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক হিসেবে, যেখানে রয়েছে হাঁটার উপযোগী প্রাণবন্ত ডাউনটাউন এবং দেশের সেরা পাবলিক স্কুলগুলোর মধ্যে কয়েকটি। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্মেলে বসবাস করা রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ক্যারি হলে এই শহরকে বলেন "আমাদের ছোট্ট স্বর্গ।"
কার্মেলে বসবাস করেন বাংলাদেশি মাসুম মাহবুব। নির্বাহী পেশার এ বাংলাদেশি নিজ বাড়িতে বসেই এ প্রতিবেদককে জানালেন, সেখানকার স্কুল, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভালোলাগার অনুভব। অল্প হলেও কিছু সংখ্যক বাংলাদেশীরা কার্মেল ও আশেপাশের এলাকায় বসবাস করেন বলে জানালেন।
কার্মেলের মেয়র সু ফিনকাম এই সাফল্যে আনন্দিত হয়ে বলেছেন, "ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্টের এক নম্বর স্থান পাওয়া একটি অসাধারণ সম্মান, যা আমাদের বাসিন্দা, ব্যবসায়িক নেতা ও শহর প্রশাসনের সম্মিলিত নিষ্ঠারই প্রতিফলন। আমরা সবসময় একটি নিরাপদ, উদ্ভাবনমুখী ও প্রাণবন্ত সমাজ গড়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছি — এটি সেই প্রচেষ্টারই স্বীকৃতি। কার্মেল সত্যিই আমেরিকার সেরা বাড়ির ঠিকানা।"
ইউএস নিউজের ভোক্তা বিশ্লেষক এরিকা জিওভানেটি বলেছেন, "কার্মেল ও ফিশার্স এমন দুটি পাশাপাশি শহর যেখানে বাসিন্দারা পকেট না কেটেই উচ্চমানের জীবনযাপন উপভোগ করতে পারেন।" এই সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের জীবনের সমন্বয়ই কার্মেলকে নিউ ইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ব্যয়বহুল শহরগুলোর চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।
এই র্যাংকিং নির্ধারণে চারটি প্রধান বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে: বাড়ির খরচ ও সাশ্রয়িতা, জীবনমান, দৈনন্দিন জীবনযাপনের পরিবেশ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। জীবনমানের মধ্যে ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বায়ুর মান এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিরাপত্তা। দৈনন্দিন পরিবেশের মধ্যে ছিল অপরাধের হার, আবহাওয়া, বিনোদনের সুযোগ এবং যাতায়াতের সময়।
শীর্ষ দশের বাকি তালিকায় টেক্সাস রাজ্য আধিপত্য দেখিয়েছে, চারটি শহর নিয়ে সেরা দশে জায়গা করে নিয়েছে। তবে ইন্ডিয়ানার এই দুই পাশাপাশি শহরের শীর্ষে থাকাটাই এই বছরের র্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছে।
কার্মেলের এই সাফল্য আমেরিকার আবাসন পছন্দে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। মহানগরের চকচকে আলো ছেড়ে মানুষ এখন খুঁজছেন সুশৃঙ্খল, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবারবান্ধব একটি সমাজ। কার্মেল ঠিক সেটাই দিচ্ছে — বড় শহরের সুযোগ-সুবিধা, ছোট শহরের আন্তরিকতা ও শান্তি। আর সেই কারণেই আমেরিকার কোটি মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা এখন ইন্ডিয়ানার এই ছোট্ট শহর।