মেসি-নেইমারের পর কে হবেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার নতুন ‘নাম্বার ১০’

স্পোর্টস ডেস্ক
  ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:০৯

বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে দুই মাসেরও বেশি সময় আগে। বিশ্বকাপের পর দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলও প্রবেশ করেছে নতুন এক চক্রে। তবে নতুন চক্রের শুরুতেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি সামনে এসেছে- নেইমার ও লিওনেল মেসির পর লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ‘নাম্বার টেন’ হবেন কে?
২০২৬ বিশ্বকাপের পর দক্ষিণ আমেরিকার জাতীয় দলগুলো নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। সামনে ২০২৮ সালের কোপা আমেরিকা। কোথায় হবে সেই টুর্নামেন্ট, এখনো নিশ্চিত নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজনের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
এরপর রয়েছে ২০৩০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব। আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে ও উরুগুয়ে আয়োজক হিসেবে সরাসরি অংশ নেবে। ফলে মহাদেশের বাকি সাত দলের বাছাইপর্ব কিভাবে হবে, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি। সম্ভাব্য একটি কাঠামো হিসেবে ১০ দলের অংশগ্রহণে নেশনস লিগের মতো প্রতিযোগিতার কথা ভাবা হচ্ছে, যেখানে একটি ট্রফিও থাকবে এবং সেই টুর্নামেন্টই বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এটিও এখনো চূড়ান্ত নয়।
অনিশ্চয়তার মধ্যেও একটি পরিবর্তন প্রায় নিশ্চিত- দক্ষিণ আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মত দলগুরোয় পরিবর্তন আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটিতে। দুই দলের জার্সির ঐতিহ্যবাহী ‘১০ নাম্বার’ জায়গাটিই এখন নতুন মুখের অপেক্ষায়।
নেইমার-পরবর্তী ব্রাজিল
২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও বড় হতাশার মুখে পড়েছে ব্রাজিল। এবার কোয়ার্টার ফাইনালেও উঠতে পারেনি তারা। ফলে বিশ্বকাপের পর পরিবর্তন যে আসবে, সেটি অনেকটাই অনুমেয় ছিল।
কোচ কার্লো আনচেলত্তি অবশ্য নিজের দায়িত্বে বহাল আছেন। তবে বিশ্বকাপের পর ঘোষিত দলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটি এবং ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচ সামনে রেখে নতুন মুখদের সুযোগ দিয়েছেন ইতালিয়ান কোচ।
নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের বিদায়কে অনেকেই নেইমার যুগেরও সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন। নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিলে এখনো কিছু মানুষের আশা আছে- হয়তো আরও কিছু দেওয়ার আছে তার; কিন্তু আনচেলত্তির বর্তমান পরিকল্পনায় সেই সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
নরওয়ের কাছে হারের দায় নিজেই নিয়েছিলেন আনচেলত্তি। দ্বিতীয়ার্ধে নেইমারকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত দলকে ভারসাম্যহীন করে দিয়েছিল বলেও স্বীকার করেছিলেন তিনি। কোনো খেলোয়াড়কে দায়ী না করলেও নেইমারকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বাইরে রাখার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন কোচ। ফলে এখন প্রশ্ন, নেইমারের জায়গা নেবেন কে?
প্রথম পছন্দ হতে পারেন হোয়াও পেদ্রো
নেইমারের জায়গায় সবচেয়ে স্বাভাবিক বিকল্প হিসেবে আবারও উঠে আসছে চেলসির হোয়াও পেদ্রোর নাম। নেইমারকে বিশ্বকাপ দলে ফেরানোর সময়ই হোয়াও পেদ্রো জায়গা হারিয়েছিলেন। এবার তাকে আবার দলে ফিরিয়েছেন আনচেলত্তি।
বিশ্বকাপের দল ঘোষণার দিন হোয়াও পেদ্রোকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে আনচেলত্তির অস্বস্তিও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবার দলে ফেরার পরই চোটে পড়েছেন চেলসি ফরোয়ার্ড। ফলে পরবর্তী আন্তর্জাতিক উইন্ডো-৯ থেকে ১৭ নভেম্বর- পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।
নেইমারের উত্তরসূরি খোঁজার বিষয়টি অবশ্য শুধু একজন নতুন ‘১০ নাম্বার’ খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আনচেলত্তির কাছে বিষয়টি অনেক বেশি কৌশলগত।
ক্যারিয়ারের শেষ দিকে নেইমারের গতি ও চলাফেরা কমে যাওয়ায় তাকে মূলত কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকার হিসেবেই দেখেছেন আনচেলত্তি। প্লে-মেকারের দায়িত্বে আগের নেইমারকে তিনি আর পাননি। ফলে আসল প্রশ্ন হলো- ব্রাজিলের আক্রমণের নেতৃত্ব নেবেন কে?
ভিনিসিয়ুস প্রস্তুত, রাফিনহাকে নিয়ে প্রশ্ন
২০২৬ বিশ্বকাপে ব্যক্তিগতভাবে ভালো পারফরম্যান্সের পর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে আক্রমণের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে। তবে রাফিনহাকে নিয়েও বড় প্রত্যাশা রয়েছে আনচেলত্তির।
বিশ্বকাপ চলাকালে চোটে পড়েছিলেন বার্সেলোনার এই ফরোয়ার্ড। মাঠে থাকা সময়েও মৌসুমের শুরুতে লা লিগায় যে আক্রমণাত্মক ঝলক দেখিয়েছিলেন, তার খুব বেশি দেখা যায়নি। তাই রাফিনহার কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনাই আনচেলত্তির অন্যতম বড় কাজ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এখানে বড় একটি পার্থক্য রয়েছে- বার্সেলোনা ও ব্রাজিলের মাঝমাঠের মান। আনচেলত্তি মনে করছেন, বর্তমান ব্রাজিল দলের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা মিডফিল্ড।
নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলের হাতে থাকার সময়ও তারা বল দখলে পিছিয়ে ছিল। আনচেলত্তির মতে, এটি খেলোয়াড়দের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। রক্ষণ ও আক্রমণে নিজের হাতে থাকা সম্পদ নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার অগ্রাধিকার এমন মিডফিল্ডার তৈরি করা, যারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
নতুনদের দিকে আনচেলত্তির নজর
এই কারণে ব্রাজিলের নতুন প্রজন্মের কয়েকজন মিডফিল্ডারের দিকে এখন নজর থাকবে। সান্তোসের গ্যাব্রিয়েল বোনতেম্পো, করিন্থিয়ান্সের বাঁ-পায়ের ব্রেনো বিদন এবং ফ্লুমিনেন্সের মার্তিনেল্লির মতো তরুণরা জাতীয় দলে নিজেদের জায়গা তৈরি করার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া ফিরে আসা আন্দ্রে সান্তোস ও ডগলাস লুইজ লড়বেন সেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের জায়গার জন্য, যে ভূমিকাটি একসময় ক্যাসেমিরোর দখলে ছিল।
তাদের সঙ্গে বিশ্বকাপের দলে থাকা ব্রুনো গিমারায়েস ও দানিলো সান্তোসও থাকছেন। আনচেলত্তির পরিকল্পনা হলো, মাঝমাঠের ভারসাম্য ঠিক করে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের জন্য আরও ভালো প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।
তার ধারণা, দলের সামগ্রিক ভারসাম্য ঠিক থাকলেই তারকা খেলোয়াড়রা নিজেদের সেরা ফুটবল উপহার দিতে পারবেন। আর সেটিই হতে যাচ্ছে নেইমার-পরবর্তী ব্রাজিলের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনা
ব্রাজিলের মতো আর্জেন্টিনাকেও এবার সামলাতে হবে তাদের সবচেয়ে বড় তারকাকে হারানোর বাস্তবতা। তবে নেইমারের মতো মেসিকে নিয়ে বিতর্ক খুব বেশি ছিল না। গত কয়েক বছরে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি ছিলেন প্রায় সর্বসম্মতভাবে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ। এবার সেই অধ্যায়েরও শেষ হতে যাচ্ছে।
৬ অক্টোবর বুয়েন্স এইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন মেসি- এমনটাই পরিকল্পনা করা হয়েছে। ম্যাচটি তাই মেসির জন্য বিদায়ী আয়োজন হতে চলেছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে তার আগের দুটি ম্যাচ। কর্ডোবায় বলিভিয়া ও বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে ম্যাচ দুটিতে মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা কীভাবে খেলবে, সেটিই বড় পরীক্ষা।
কারণ মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ কী হবে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে এখনই। ফুটবলের ইতিহাসও এই চ্যালেঞ্জের কঠিনতা মনে করিয়ে দেয়। পেলের অবসরের পর ব্রাজিলকে দীর্ঘ সময় ধরে নতুন যুগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
একইভাবে দিয়েগো ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনাকেও নতুন নেতৃত্ব খুঁজতে হয়েছে। এবার মেসির পর আর্জেন্টিনা কতটা সফলভাবে রূপান্তর ঘটাতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।
মেসির জায়গায় নিকো পাজ?
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি মূলত বিশ্বকাপের দলটির প্রায় পুরো কাঠামোকেই ধরে রেখেছেন। কিছু নতুন মুখ যুক্ত হলেও মূল দলটি একই থাকছে। এর একটি কারণ হতে পারে বিদায়পর্বের আবহ। এমনকি বছরের শেষে স্কালোনির চুক্তিও শেষ হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি নতুন ‘১০ নাম্বার’ খুঁজে দেখার জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাও।
মেসি আগেও আর্জেন্টিনার সব বাছাই ম্যাচ খেলেননি। সর্বশেষ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ১৮ ম্যাচের মধ্যে তিনি শুরু থেকে খেলেছিলেন ১০টিতে। তার অনুপস্থিতিতে আর্জেন্টিনা সাধারণত আক্রমণভাগের খেলোয়াড় হুলিয়ান আলভারেজের প্রতিভা, দৌড়ের ক্ষমতা ও বহুমুখী দক্ষতাকে ব্যবহার করেছে। ভবিষ্যতেও আলভারেজ আর্জেন্টিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবেন। তবে এবার একজন প্রকৃত ‘নম্বর টেন’কে পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ রয়েছে।
সেই জায়গায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন কোমোর নিকো পাজ। সাবেক আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের ছেলে নিকো পাজ সিরি আ’য় নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তবে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে এখন পর্যন্ত ১১ ম্যাচে তার কাছ থেকে খুব বেশি কিছু পাওয়া যায়নি।
এর অন্যতম কারণ ছিল মেসির সঙ্গে তাকে একই একাদশে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা। দু’জনই পায়ে বল নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। ফলে একই দলে তাদের জায়গা করে দেওয়া সহজ ছিল না। মেসি যখন থাকছেন না, তখন সেই সমস্যা আর থাকবে না। তাই পাজকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাস্তানতুয়ানো ও আলমাদা
নিকো পাজের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার নতুন ‘১০ নাম্বার’ হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন আরও কয়েকজন তরুণ। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ধারে ফিওরেন্তিনায় খেলা ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়ানো মৌসুমের শুরুটা ভালো করেছেন। জাতীয় দলেও নিজের জায়গা করে নেওয়ার জন্য তার আগ্রহ থাকবে।
চোট কাটিয়ে ফিরলে থিয়াগো আলমাদাও এই প্রতিযোগিতায় থাকবেন। রিভার প্লেটে যোগ দেওয়ার পর আর্জেন্টিনার দর্শকদের সামনে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। ফলে জাতীয় দলে নিজের দাবি তুলে ধরার সুযোগও তার সামনে থাকছে।
মেসি ও নেইমার নিজ নিজ জাতীয় দলের হয়ে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি করেছেন, যেগুলো দীর্ঘদিন মনে রাখবে ফুটবলবিশ্ব। তাদের বিদায়ের পর নতুন প্রজন্মের সামনে এখন সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ।
ব্রাজিলে নেইমারের পর কে আক্রমণের নেতৃত্ব নেবেন, আর আর্জেন্টিনায় মেসির পর কে সামলাবেন ‘১০ নাম্বার’- এই দুই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই শুরু হয়েছে। বিশ্বকাপ-পরবর্তী নতুন চক্রের শুরুতে তাই দক্ষিণ আমেরিকার দুই পরাশক্তির সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে উঠেছে নতুন ‘নাম্বার টেন’ খোঁজার লড়াই।