
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হতে যাচ্ছে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে ঘিরে এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গত দুই দশকের দুই মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি। তবে প্রশ্ন উঠছে, নতুন প্রজন্মের সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে কি ইতোমধ্যেই জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক আকর্ষণের ক্ষেত্রে তাদের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ফেলেছেন?
৪১ বছর বয়সি রোনালদো এবং ৩৮ বছর বয়সি মেসির জন্য এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই শেষ বিশ্বকাপ। অন্যদিকে ২৭ বছর বয়সি এমবাপ্পে তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন এবং ইতোমধ্যে বিশ্বকাপজয়ী ও গোল্ডেন বুটজয়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে বিভিন্ন সূচকে তিন তারকার অবস্থান বিশ্লেষণ করেছে ক্রীড়াবিশ্লেষকরা।
টিকিট বিক্রিতে এগিয়ে মেসি
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ সবচেয়ে আগে বিক্রি শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর টিকিট। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফার টিকিট বিক্রিতেই আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা শীর্ষে ছিলেন। এর পেছনে মেসির শেষ বিশ্বকাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে তার বিপুল জনপ্রিয়তা বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
ফ্রান্স ও পর্তুগালের ম্যাচগুলোর টিকিটও পরে বিক্রি শেষ হয়ে যায়। তবে পুনর্বিক্রয় বাজারে পর্তুগাল-কলম্বিয়া ম্যাচের টিকিটের দাম ৩ হাজার থেকে ১২ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে সবার ওপরে এমবাপ্পে
বিশ্বকাপে গোল করার ক্ষেত্রে এমবাপ্পে বর্তমানে সবচেয়ে কার্যকর।
কিলিয়ান এমবাপ্পে: ১৪ ম্যাচে ১২ গোল, ৫ অ্যাসিস্ট
লিওনেল মেসি: ২৬ ম্যাচে ১৩ গোল, ৮ অ্যাসিস্ট
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো: ২২ ম্যাচে ৮ গোল, ২ অ্যাসিস্ট
মাত্র দুটি বিশ্বকাপ খেলেই এমবাপ্পে রোনালদোর মোট গোলসংখ্যা ছাড়িয়ে গেছেন এবং মেসির চেয়ে মাত্র এক গোল পিছিয়ে আছেন।
অনলাইন অনুসন্ধানে রোনালদোর আধিপত্য
গুগলের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনুসন্ধান করা ক্রীড়াবিদ রোনালদো।
২০২৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, প্রতি মাসে গড়ে ১ কোটির বেশি বার রোনালদোকে খোঁজা হয়েছে। সেখানে মেসির গড় অনুসন্ধান প্রায় ৩২ লাখ ৭৬ হাজার এবং এমবাপ্পের প্রায় ৩১ লাখ ৩২ হাজার।
অনলাইন জনপ্রিয়তার দিক থেকে তাই এখনো রোনালদো অনেকটাই এগিয়ে।
সবচেয়ে বেশি আয় রোনালদোর
বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ক্রীড়াবিদদের তালিকায় এখনো শীর্ষে রয়েছেন রোনালদো।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালে তার বার্ষিক আয় ছিল ২৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে সৌদি ক্লাব আল-নাসরের কাছ থেকে পেয়েছেন প্রায় ২৩ কোটি ডলার।
মেসির মোট আয় ছিল ১২ কোটি ডলার। এর মধ্যে বেতন ৫ কোটি ডলার এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ড চুক্তি থেকে আয় ৭ কোটি ডলার।
এমবাপ্পের মোট আয় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপের সর্বোচ্চ বেতনভোগী ফুটবলার হলেও বাণিজ্যিক আয়ের দিক থেকে তিনি এখনো দুই কিংবদন্তির অনেক পিছনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শীর্ষে রোনালদো
ইনস্টাগ্রামে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনুসারী থাকা ক্রীড়াবিদ রোনালদো। তার অনুসারীর সংখ্যা ৬৬ কোটি ৪০ লাখের বেশি।
মেসির অনুসারী প্রায় ৫০ কোটি ৬০ লাখ এবং এমবাপ্পের ১৩ কোটি।
২০২৪ সালে রোনালদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোট ১০০ কোটির বেশি অনুসারী পাওয়া বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হন।
ক্লাব ফুটবলের বর্তমান পারফরম্যান্সে সেরা এমবাপ্পে
বর্তমান সময়ে ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে খেলছেন একমাত্র এমবাপ্পে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে লা লিগায় ৩২ ম্যাচে ২৫ গোল করে পিচিচি ট্রফি জিতেছেন তিনি।
এর আগের মৌসুমে ৩৪ ম্যাচে ৩১ গোল করে ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটও জিতেছিলেন।
অন্যদিকে মেসি যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে ২৯ গোল এবং রোনালদো সৌদি প্রো লিগে ৩০ ম্যাচে ২৮ গোল করেছেন। তবে প্রতিযোগিতার মানের বিচারে এমবাপ্পের সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্যিক আকর্ষণে নতুন রাজা এমবাপ্পে?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে স্পন্সর ও ব্র্যান্ডগুলোর কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবলার হয়ে উঠছেন এমবাপ্পে।
এর প্রধান কারণ তিনি বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের তারকা এবং ইউরোপের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় লিগে খেলছেন। ফলে তার ম্যাচ ও পারফরম্যান্স বিশ্বজুড়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।
শেষ কথা
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ জনপ্রিয়তা, অনুসারী, আয় ও বৈশ্বিক পরিচিতির ক্ষেত্রে এখনো রোনালদো ও মেসির প্রভাব অটুট। তবে মাঠের পারফরম্যান্স, বয়স এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনার বিচারে এমবাপ্পে দ্রুত তাদের উত্তরসূরি হয়ে উঠছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯ জুলাই বিশ্বকাপের শিরোপা কার হাতে ওঠে, সেটিই হয়তো নির্ধারণ করবে—ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় তারকার মুকুট এখনো রোনালদো-মেসির মাথায় থাকবে, নাকি সেটি স্থায়ীভাবে চলে যাবে এমবাপ্পের হাতে।
সূত্র: আল-জাজিরা স্পোর্টস