
বিশ্বকাপের আগে জার্সি উন্মোচনকে ঘিরে বড় ধরনের বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছে নরওয়ে জাতীয় ফুটবল দল। দলটির তারকা ফরোয়ার্ড আর্লিং হালান্ড এবং তার সতীর্থদের অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি ভাইকিং-প্রধান ফটোশুট দেশটির ক্রীড়াঙ্গন ও সমাজে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একদিকে যেমন সমর্থন দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে অনেকেই তীব্র আপত্তি তুলেছেন।
ফটোশুটটি আয়োজন করা হয়েছিল নরওয়ের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে। সমুদ্রসৈকতের পটভূমিতে ধারণ করা ছবিগুলোতে খেলোয়াড়দের ভাইকিং যুগের অনুষঙ্গ বহনকারী বিভিন্ন সামগ্রীর সঙ্গে দেখা যায়। তাদের হাতে ছিল ঐতিহ্যবাহী ঢাল, কুঠার, ধনুক ও তীর। এছাড়া ছবির পেছনে রাখা হয়েছিল ভাইকিংদের বিখ্যাত নৌযানের প্রতিরূপ। একইসঙ্গে বিশ্বকাপ উপলক্ষে তৈরি বিশেষ জার্সির নকশায় ব্যবহার করা হয়েছে কিছু রুনিক লিপি এবং প্রাচীন নর্স প্রতীক, যা ভাইকিং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত।
তবে এই উপস্থাপনাকেই ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, ভাইকিং ইতিহাসের কিছু দিককে অত্যধিক গৌরবান্বিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের দাবি, ভাইকিং যুগ শুধু অভিযাত্রা ও সাহসিকতার ইতিহাস নয়, বরং যুদ্ধ, লুণ্ঠন এবং সহিংসতার সঙ্গেও জড়িত। তাই এমন প্রতীক ও চিত্রকল্প ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
নরওয়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। কয়েকজন বিশ্লেষক ও গবেষক মনে করছেন, ফটোশুটে ব্যবহৃত কিছু প্রতীক এবং উপস্থাপনার ধরন চরম জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রচারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, ঐতিহাসিক প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট ও বার্তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি, যাতে কোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি না হয়।
নরওয়ের পরিচিত সাংবাদিক মারকুস স্লেটহোম এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, কিছু চিত্র ও প্রতীক এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যা সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের পরিবর্তে বিভাজনের ধারণা উসকে দিতে পারে। তার মতে, এই ধরনের উপস্থাপনা অতীতের কিছু উগ্রপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রচারণার স্মৃতিও মনে করিয়ে দেয়।
একইভাবে গবেষক জেন হগ স্কজল্ডলিও জার্সির নকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, ব্যবহৃত কিছু প্রতীক এমন কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যেগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ফলে তিনি মনে করেন, ডিজাইন তৈরির সময় বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে, নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন কিংবা জাতীয় দলের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপনের প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তাদের দৃষ্টিতে এটি দেশের ইতিহাস ও পরিচয়কে তুলে ধরার একটি সৃজনশীল উদ্যোগ, যার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা আদর্শিক বার্তার সম্পর্ক নেই।
বিশ্বকাপের ঠিক আগে এমন বিতর্ক সামনে আসায় বিষয়টি দলের প্রস্তুতিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে নরওয়ের প্রধান কোচ এ নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে রাজি নন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে জানান, দলের সামনে এখন বিশ্বকাপের মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং তার কাছে সেই প্রস্তুতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিতর্ককে তিনি অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, এমন আলোচনা নিয়ে সময় ব্যয় করার কোনো প্রয়োজন তিনি অনুভব করেন না।
সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নরওয়ে জাতীয় দলের ভাইকিং-থিমভিত্তিক ফটোশুট দেশটির সাংস্কৃতিক পরিচয়, ইতিহাসের উপস্থাপন এবং প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই এই বিষয়টি নরওয়ের ফুটবল অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত প্রসঙ্গে পরিণত হয়েছে।