অবশেষে স্বীকৃতি পাচ্ছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্তরা

স্পোর্টস ডেস্ক
  ০৫ মার্চ ২০২৬, ২৩:৩০

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে। ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ঘোষিত জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠকদের হাতে অবশেষে তুলে দেওয়া হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘোষিত তালিকার সবাইকে দ্রুত সময়ের মধ্যে পুরস্কার প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য নতুন করে পুরস্কার বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, পূর্বঘোষিত তালিকার পুরস্কার ঝুলে থাকায় ক্রীড়াঙ্গনে তৈরি হয় অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা। অভিযোগ ওঠে, সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভুইয়া পূর্বঘোষিত নামগুলো উপেক্ষা করেই নতুন তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তবে বর্তমান সরকারের হস্তক্ষেপে সেই জট কাটছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—ঘোষিত কেউ যেন বঞ্চিত না হন।
জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ১৯৭৬ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই পুরস্কারের প্রবর্তন করেন। প্রথম বছর আটজন ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক এ সম্মাননা পান। ছয় বছর নিয়মিত প্রদান শেষে ১৯৮২ সালে এটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৯৬ সালে পুনরায় চালু হয় পুরস্কার প্রদান কার্যক্রম। ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩১৪ জন ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়া সংগঠক এ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তদের দেওয়া হয় একটি স্বর্ণপদক, সনদপত্র, নগদ এক লাখ টাকা ও একটি ব্লেজার।
অতীতে এই পুরস্কার ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। যোগ্যদের পাশাপাশি তদবিরের মাধ্যমে কেউ কেউ তালিকায় স্থান পেয়েছেন—এমন অভিযোগে একসময় এটি ‘তদবির পুরস্কার’ নামেও পরিচিতি পায়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক তালিকাগুলোতে যোগ্যতার ভিত্তিতেই নির্বাচন হয়েছে।
২০২৩ সালের জন্য চূড়ান্ত ১১ জনের তালিকায় রয়েছেন—শুটার শারমিন আক্তার রত্না, সাঁতারু ডলি আক্তার, ফুটবলার রুমি রিজভী করিম, ফুটবলার মাহফুজুল মামুন বাবু, ভারোত্তোলক ফাহিমা আক্তার ময়না, ক্রিকেটার মাইনুল হক (মাইনু), তায়কোয়ান্দোকা মিজানুর রহমান, পর্বতারোহী নিশাত মজুমদার, স্পেশাল অলিম্পিক অ্যাথলেট বিবি ফাতেমা, ফ্লোর হকি ও বৌচি খেলোয়াড় এসএম ফেরদৌস ইকরাম এবং ক্রীড়া সংগঠক তরফদার মো. রুহুল আমিন।
শারমিন আক্তার রত্না ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে দেশের অন্যতম সফল শুটার। ২০১০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে একক ও দলগত স্বর্ণ জয়ের পর দীর্ঘদিন জাতীয় শুটিংয়ের মুখ হয়ে ছিলেন তিনি। ডলি আক্তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শতাধিক পদক জয় করে দেশের সাঁতারে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। এসএ গেমস, এশিয়ান গেমস ও বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি। নিশাত মজুমদার ২০১২ সালের ১৯ মে এভারেস্ট জয় করে দেশের প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। অন্যদিকে ব্যবসায়ী হলেও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন তরফদার মো. রুহুল আমিন; ফুটবল, সাঁতার ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে অবদান রাখছেন তিনি।
২০২১ সালের জন্য মনোনীত ১০ জনের মধ্যে রয়েছেন—প্রয়াত একেএম নওশেরুজ্জামান, গোলাম কুদ্দুস চৌধুরী বাবু, ফারুক আহমেদ, আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ কিসলু, ইয়াদ আলী, রাসেল কবির সুমন, নাজমুন নাহার বিউটি, জুয়েল আহম্মেদ, একেএম মারুফুল হক ও শাহনাজ পারভীন মালেকা। ২০২২ সালের তালিকায় রয়েছেন—মাহবুব আরা বেগম গিনি, মির্জা সালমান ইস্পাহানী, সৈয়দ রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বির, মেরিনা খানম মেরি, আলফাজ আহমেদ, জিএস হাসান তামিম, রফিকুল ইসলাম কামাল, মাহফুজা খাতুন শিলা, এনায়েত উল্লাহ খান ও ইমদাদুল হক মিলন।
জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতে বহু প্রথিতযশা ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক জীবদ্দশায় এই স্বীকৃতি পাননি। কারও কারও নাম চূড়ান্ত হলেও প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় তারা সেই সম্মাননা দেখে যেতে পারেননি। ফলে তাদের পরিবার আজও অপেক্ষায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির। ক্রীড়াঙ্গনের অভিজ্ঞদের মতে, পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের বিতর্ক অনেকটাই কমে আসবে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘোষিত তালিকা থেকে কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মনোনীত সবাইকে যথাযথ মর্যাদায় পুরস্কার দেওয়া হবে। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। এ ছাড়া ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য মনোনীতদেরও একসঙ্গে পদক তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটছে। ক্রীড়াঙ্গনে ফিরছে আস্থা। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার শুধু একটি পদক নয়; এটি এক জীবনের সাধনা, পরিশ্রম ও অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতি অবশেষে হাতে পেতে চলেছেন ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালের ঘোষিত ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকরা—এটাই এখন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের বড় স্বস্তির খবর।