১৪ ফেডারেশনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

স্পোর্টস ডেস্ক
  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:৩১

 

গত বছর সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে অনুশীলন ক্যাম্পের ক্রয়কৃত বিভিন্ন সরঞ্জামে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা অর্থ আত্মসাত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। 
গত ১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ক্রীড়া শাখা থেকে একটি চিঠি পেয়ে রীতিমত ক্ষোভে ফুসছে ১৪টি ক্রীড়া ফেডারেশনের কর্তা ব্যক্তিরা। যে চিঠিতে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সরাসরি অভিযোগ এনেছে এনএসসি। ১৪টি ফেডারেশন এই চিঠির প্রাপ্তির প্রেক্ষিতে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছে। শিগগিরই এ চিঠির পাল্টা জবাব দিয়ে আত্মসাতের মতো ‘আপত্তিকর’ শব্দ ব্যবহারের ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিকল্পনা করেছে ফেডারেশনগুলো।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) আমিনুল এহসানের সাক্ষরিত চিঠিতে ১৪টি ক্রীড়া ফেডারেশনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠির বিষয়বস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়- পিপিআর, ২০০৮ লঙ্ঘন করে নামমাত্র কোটেশন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের ফলে আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে অডিট আপত্তির জবাব প্রদান।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- ‘১৪তম সাউথ এশিয়ান গেমস-২০২৬-এ অংশগ্রহণের লক্ষ্যে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের জন্য আরচারি, অ্যাথলেটিকস, ব্যাডমিন্টন, বক্সিং, ফেন্সিং, গলফ, জুডো, কারাতে, রেসলিং, সুইমিং, শুটিং, টেবিল টেনিস, টেনিস এবং তায়কোয়ানডোসহ ১৪টি ফেডারেশনকে চেকের মাধ্যমে দুই কোটি ৯৪ লাখ ৯৬ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়। 
উক্ত টাকা থেকে কোটেশনের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের পোশাক ক্রয় দেখিয়ে ৩৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়। উল্লেখিত ফেডারেশনগুলোর কোটেশনের মাধ্যমে ক্রয় সংক্রান্ত দাখিলকৃত কাগজপত্র ও বিল ভাউচার যাচাই করে দেখা গেছে যে, কোটেশনের কাগজপত্রের সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর, ভ্যাট নিবন্ধন সংক্রান্ত দলিলাদি এবং আর্থিক সচ্ছলতার সমর্থনে ব্যাংক সনদ নেই। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নামমাত্র কোটেশন দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ প্রেরিত চিঠিতে আরও উল্লেখ আছে- ‘পিপিআর, ২০০৮ এর বিধি ৭০ (২) অনুযায়ী দরদাতাদের যোগ্যতার সমর্থনে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, ভ্যাট নিবন্ধন এবং আর্থিক সচ্ছলতার ব্যাংক সনদপত্র দাখিল করা বাধ্যতামূলক। তবে এক্ষেত্রে বিধি লঙ্ঘন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই পোশাক ক্রয় দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করায় উল্লেখিত টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।’ 
এ অবস্থায় কোটেশনের কাগজপত্রের সঙ্গে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সকল তথ্য আগামী ৩ দিনের মধ্যে পরিষদের পরিচালকের (অর্থ) কাছে দাখিল করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।
এ চিঠি পাওয়ার পর থেকেই ক্রীড়া ফেডারেশনের কর্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। 
বাংলাদেশ বক্সিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এমএ কুদ্দুস বলেন, ‘ক্রীড়া পরিষদ ফেডারেশনগুলোর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ এনেছে, সেটা কোন অবস্থাতেই মেনে নেওয়া যায় না। অতীতে কখনই ক্রীড়া সরঞ্জামাদী যে প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রয় করা হয়, সে প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএনসহ এসব কাগজ আমাদের কাছে চাওয়া হয়নি। তারা চিঠি দিয়ে আমাদের কাছে এসব কাগজ চাইতে পারত। অথচ চিঠিতে তারা উল্লেখ করেছে আমরা টাকা আত্মসাত করেছি। তাই আমরা ফেডারেশনগুলো একসঙ্গে এর জবাব প্রস্তুত করেছি। লিখিত জবাব আমরা অতি শিঘঘরই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দেব।’
বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের চিঠির জবাবে তারা যে চিঠি প্রস্তুত করেছেন, সেটার উল্লেখযোগ্য অংশগুলো সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। 
তানভীরের ভাষ্য মতে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো তাদের প্রস্তুতকৃত চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো মূলত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অনুমোদিত কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফেডারেশনগুলোর নিজস্ব কোনো বড় আয়ের উৎস নেই; এগুলো যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয়। 
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যেসব কাগজপত্রের অভাবের কথা উল্লেখ করেছে, সেগুলো ইতিপূর্বে কখনো নির্ধারিতভাবে চাওয়া হয়নি। ফেডারেশনগুলো সাধারণত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে দুই-তিন দিনের মধ্যে বিল পরিশোধের শর্তে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়। জরুরি পরিস্থিতিতে দুই-একটি কাগজ বাদ পড়তে পারে। জবাবে তারা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পত্রে ‘অর্থ আত্মসাৎ’ শব্দটি ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে প্রকৃত ব্যয়ের বিনিময়েই পোশাক কেনা হয়েছে এবং অর্থ আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন।
একই সঙ্গে গত জুন মাসে অর্থ প্রদানের ৭ মাস পরে এই ধরণের কাগজপত্র চাওয়াকে ফেডারেশনগুলো হয়রানিমূলক ও মানহানিকর বলে মনে করে। তারা মনে করে, সঠিক সময়ে যাচাই-বাছাই না করে দীর্ঘ সময় পর অডিট আপত্তি তোলা (জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের) কর্মকর্তাদের অবহেলার প্রমাণ। 
এ ধরণের ‘মিথ্যা অপবাদ’ ও আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করে আনুষ্ঠানিক পত্র ইস্যু করার ফলে ফেডারেশনগুলোর মনোবল ভেঙে যাচ্ছে, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ক্ষতিকর। ফেডারেশনগুলো দাবি করেছে, যাতে ভবিষ্যতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সঠিক ভাষা প্রয়োগ এবং সম্মান বজায় রেখে চিঠি প্রেরণ করে।
উল্লেখ্য, পোষাক ও ক্রীড়া সরঞ্জাম ক্রয় বাবদ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আরচারি ফেডারেশনকে ২২ লাখ ৫৫ হাজার ৫০০ টাকা, অ্যাথলেটিকসকে ৩১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যাডমিন্টনকে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টাকা, বক্সিংকে ২০ লাখ ২৯ হাজার ৫০০ টাকা, ফেন্সিংকে ২১ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা, গলফকে ১৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা, জুডোকে ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা, কারাতেকে ২৮ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা, রেসলিংকে ২১ হাজার ৫৫ হাজার ৫০০ টাকা, সাঁতারকে ২৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা, শুটিংকে ২২ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা, টেবিল টেনিসকে ১৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা, টেনিসকে ১৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা এবং তায়কোয়ান্দো ফেডারেশনকে ২৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।