
মানুষ সামাজিক জীব। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা সহকর্মী—সব সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহনশীলতা। কিন্তু যখন রাগ, অহংকার, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা কটু কথার প্রবেশ ঘটে, তখন সেই সম্পর্কগুলো মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে শুরু করে। একটি অসতর্ক বাক্য কখনো বহু বছরের ভালোবাসাকে মুছে দিতে পারে, একটি ছোট্ট বিরোধ বড় শত্রুতায় রূপ নিতে পারে।
বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মতপার্থক্যকে অনেকেই ব্যক্তিগত বিরোধে পরিণত করেন। সহনশীলতার পরিবর্তে অসহিষ্ণুতা, সংলাপের পরিবর্তে তর্ক এবং ক্ষমার পরিবর্তে প্রতিশোধের মনোভাব দিন দিন বাড়ছে। অথচ ইসলাম মানুষের মাঝে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ধর্ম। কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের এমন কিছু নীতিমালা শিক্ষা দিয়েছে, যা অনুসরণ করলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ঝগড়া-বিবাদমুক্ত রাখা সম্ভব।
নিচে ঝগড়া-বিবাদ থেকে বেঁচে থেকে ইসলামের আলোকে সম্পর্ক রক্ষার ৮টি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহভীতি (তাকওয়া) অর্জন করুন
ঝগড়া-বিবাদের অন্যতম কারণ হলো আল্লাহর ভয় ও জবাবদিহিতার অনুভূতি দুর্বল হয়ে যাওয়া। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে, সে অন্যায় কথা, অপমান বা অবিচার থেকে নিজেকে বিরত রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ
‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন কর।’ (সুরা আল-আনফাল: আয়াত ১)
২. রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন
অধিকাংশ ঝগড়ার সূচনা হয় নিয়ন্ত্রণহীন রাগ থেকে। তাই ইসলাম রাগ দমনকে একজন মুমিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪, মুসলিম ২৬০৯)
৩. অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক থেকে বিরত থাকুন
সব বিষয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠা করাই প্রজ্ঞার পরিচয় নয়। অনেক সময় নীরবতা ও তর্ক পরিহার করাই বড় জয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَنَا زَعِيمٌ بِبَيْتٍ فِي رَبَضِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْمِرَاءَ وَإِنْ كَانَ مُحِقًّا
‘যে ব্যক্তি সত্যের ওপর থাকা সত্ত্বেও তর্ক-বিতর্ক পরিহার করে, আমি তার জন্য জান্নাতের প্রান্তে একটি ঘরের জামিন।’ (আবু দাউদ ৪৮০০)
৪. কোমল ও নম্র ভাষায় কথা বলুন
কঠোর ভাষা মানুষের অন্তরে ক্ষত সৃষ্টি করে, আর কোমল ভাষা কঠিন হৃদয়কেও নরম করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ
‘তোমরা তার সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলো; হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা ত্বহা: আয়াত ৪৪)
৫. ক্ষমাশীলতার অভ্যাস গড়ে তুলুন
ক্ষমা মানুষের মর্যাদা কমায় না; বরং আল্লাহর কাছে তার সম্মান বৃদ্ধি করে। ক্ষমাশীল ব্যক্তি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ
‘ক্ষমা অবলম্বন কর, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অজ্ঞদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।’ (সুরা আল-আরাফ: আয়াত ১৯৯)
৬. গীবত, অপবাদ ও কুৎসা রটানো থেকে বিরত থাকুন
পরনিন্দা, অপবাদ ও একের কথা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া অসংখ্য সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়। সমাজে অধিকাংশ বিবাদের পেছনে এসবের বড় ভূমিকা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
‘তোমরা একে অপরের গীবত কর না।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১২)
৭. সালামের প্রসার ঘটান ও সম্পর্ক দৃঢ় করুন
সালাম, হাসিমুখে কথা বলা এবং একে অপরের খোঁজখবর নেওয়া হৃদয়ের দূরত্ব কমিয়ে দেয় এবং ভালোবাসা বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ
‘তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার ঘটাও।’ (মুসলিম ৫৪)
৮. বিরোধ মীমাংসায় এগিয়ে আসুন
দুই মুসলিমের মধ্যে মিল-মহব্বত প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম হলো বিরোধ নিষ্পত্তি করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ
‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِأَفْضَلَ مِنْ دَرَجَةِ الصِّيَامِ وَالصَّلَاةِ وَالصَّدَقَةِ؟ إِصْلَاحُ ذَاتِ الْبَيْنِ
‘আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা বলব না, যা নফল রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়েও উত্তম? তা হলো মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক মীমাংসা করে দেওয়া।’ (তিরমিজি ২৫০৯, আবু দাউদ ৪৯১৯)
ঝগড়া-বিবাদ কখনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনে না; বরং এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের শান্তি ও সম্প্রীতিকে ধ্বংস করে দেয়। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়— রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে, অহেতুক বিতর্ক এড়াতে, ক্ষমাশীল হতে, কোমল ভাষায় কথা বলতে এবং মানুষের মাঝে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। যে ব্যক্তি নিজের নফসকে সংযত রাখে, অন্যের ভুল ক্ষমা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পর্ক রক্ষা করে, সে দুনিয়ায় মানুষের ভালোবাসা অর্জন করে এবং আখিরাতে মহান প্রতিদান লাভের সৌভাগ্য অর্জন করে।
আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে শান্তির দূত হওয়ার অঙ্গীকার করি। মতভেদকে শত্রুতায় নয়, বরং প্রজ্ঞা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে পবিত্র করুন, পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করুন এবং আমাদেরকে তার সন্তুষ্টির পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।