
সাবেক মার্কিন যাজক স্যামুয়েল আর্ল শ্রপশায়ার (Samuel Earle Shropshire)-এর খ্রিস্টধর্ম থেকে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার ঘটনাটি ছিল বেশ দীর্ঘ ও গভীর এক আধ্যাত্মিক যাত্রার ফসল। নিচে তার ইসলাম গ্রহণের বিস্তারিত ঘটনাক্রম আলোচনা করা হলো:
কুরআন অনুবাদ প্রকল্পে অংশগ্রহণ: ২০১১ সালে স্যামুয়েল শ্রপশায়ারকে সৌদি আরবের জেদ্দায় একটি নতুন ইংরেজি কুরআন অনুবাদের কাজ পুনর্নিরীক্ষণ বা এডিটিংয়ের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান যাজক ও ধর্মতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে তিনি মুসলিমদের এই পবিত্র গ্রন্থের ভুলত্রুটি ধরার মানসিকতা নিয়ে কাজটি শুরু করেন।
কুরআনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন: কাজ করতে গিয়ে তিনি পুরো কুরআন গভীরভাবে পাঠ ও বিশ্লেষণ করেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসলামকে যেভাবে উগ্র ও নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কুরআনের মূল বাণী তার সম্পূর্ণ বিপরীত। বিশেষ করে কুরআনে আল্লাহর একত্ববাদ (তৌহিদ), হযরত ঈসা (আ.) বা যিশু এবং হযরত মারিয়াম (আ.)-এর প্রতি যে সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করা হয়েছে, তা তার হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
মুসলিমদের সামাজিক আতিথেয়তা: জেদ্দায় অবস্থানকালে তিনি স্থানীয় সাধারণ মানুষের আচরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। আমেরিকান গণমাধ্যমের প্রচারণার কারণে শুরুতে তার মনে মুসলিমদের নিয়ে যে ভয় ও সংশয় ছিল, তা জেদ্দার মানুষদের উদারতা, নম্রতা এবং অসাধারণ আতিথেয়তা দেখে পুরোপুরি কেটে যায়।
মসজিদে যাওয়ার অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা: সৌদি আরবে প্রায় ৬ মাস কাটানোর পর এক সন্ধ্যায় মাগরিবের আযানের শব্দ শুনে তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন তৈরি হয়। তিনি ঘর থেকে বের হয়ে সোজা চলে যান স্থানীয় 'মসজিদ আত-তাকওয়া'-র দরজায়। একজন খ্রিস্টান হিসেবে ভেতরে প্রবেশ করা যাবে কি না, তা নিয়ে তিনি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন এবং দীর্ঘক্ষণ দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। পরবর্তীতে মসজিদের মুয়াযযিন শাফি জুবিয়া দরজা খুলে তাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে জড়িয়ে ধরেন এবং মসজিদে স্বাগত জানান।
আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ: মসজিদের ভেতরে মুসল্লিদের সারিবদ্ধভাবে নামাজ আদায় এবং তাদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধ দেখে তিনি অভিভূত হন। ইসলামের সত্যতা এবং স্রষ্টার একত্ববাদের বিষয়টি অনুধাবন করে তিনি আর দেরি করেননি। তিনি উপস্থিত সবার সামনে আন্তরিকভাবে শাহাদাহ পাঠ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
পারিবারিক প্রতিক্রিয়া ও জীবনের পরিবর্তন
পারিবারিক সম্পর্ক: তার ইসলাম গ্রহণের পর প্রথমদিকে পরিবারের কিছু সদস্য এবং পুরনো খ্রিস্টান বন্ধুরা বেশ অবাক হন এবং দূরত্ব বজায় রাখেন। তবে পরবর্তীতে তার সুন্দর আচরণ এবং ইসলামের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা দেখে তাদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই কমে আসে।
সাংস্কৃতিক রূপান্তর: একজন মার্কিন যাজক থেকে তিনি একজন মুসলিম প্রচারকে পরিণত হন। তিনি তার জীবনযাত্রায় ইসলামিক মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করতে শুরু করেন এবং বিশ্বজুড়ে একজন শান্তিকামী মুসলিম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
এমভিপিআর (MVPR) সংস্থার কার্যক্রম
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি অনুভব করেন যে, বিশ্বের অমুসলিমদের কাছে ইসলামের সঠিক এবং শান্তিময় বার্তা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি Muslim Voice for Peace & Reconciliation (MVPR) নামক একটি আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল কার্যক্রমগুলো হলো:
ভুল ধারণা দূর করা: পশ্চিমা বিশ্বে এবং অন্যান্য অমুসলিম সমাজে ইসলাম সম্পর্কে যে ধরনের উগ্র বা নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে, তা দূর করতে তিনি কাজ করেন।
আন্তঃধর্মীয় সংলাপ: বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়া বৃদ্ধির জন্য তিনি নিয়মিত সেমিনার, সংলাপ ও সেমিনারের আয়োজন করেন।
শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা: কুরআনের মূল বাণী—শান্তি, ন্যায়বিচার এবং মানবতার কল্যাণকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরাই এই সংস্থার প্রধান উদ্দেশ্য।
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তার বাকি জীবন ইসলাম ও মানবতার সেবায় নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন।