
দেশের প্রশাসনিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে নতুন এক ইতিহাস রচিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন একজন পেশাদার আলেম ও মসজিদের ইমাম। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ-এর পেশ ইমাম, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী-কে এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ নিয়োগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন আইন, ১৯৭৫-এর ধারা ৫(ক)(১) ও ৫(ক)(২) অনুযায়ী অন্যান্য পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য তাঁকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পেশাদার আলেম ও মসজিদের ইমামকে সচিব পদমর্যাদার এমন উচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করা হলো। ফলে এ নিয়োগকে প্রশাসনিক ও ধর্মীয় উভয় অঙ্গনেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বহুমাত্রিক শিক্ষায় গড়ে ওঠা একজন আলেম
মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী কওমি, আলিয়া ও আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সমন্বয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। তার শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও কৃতিত্বপূর্ণ।
তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, ভারতের প্রসিদ্ধ দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আরবি বিভাগে অধ্যয়ন করেন।
কওমি শিক্ষায় দাওরায়ে হাদিস, আলিয়া শিক্ষায় কামিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মাস্টার্স— সব ক্ষেত্রেই তিনি অসাধারণ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন তাঁর মেধা ও একাডেমিক উৎকর্ষতার উজ্জ্বল প্রমাণ।
শিক্ষকতা, গবেষণা ও ইসলামী অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান
কর্মজীবনে তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, গবেষক ও প্রশিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম-সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের দারুল মারিফ ও দারুল উলুম মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও পাঠদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তাঁর হাত ধরে অসংখ্য শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও ইসলামী আদর্শে শিক্ষিত হয়েছেন।
দেশের ইসলামী অর্থনীতি ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার উন্নয়নেও রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সর্বশেষ তিনি সেন্ট্রাল শরীয়াহ কাউন্সিল ফর ইসলামী ব্যাংকস অব বাংলাদেশ-এর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এ ছাড়া তিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসি-এর শরিয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি ইসলামী উইংয়ের শরিয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক-সহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকীর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের ধর্মীয় শিক্ষা, আলেম সমাজ ও ইসলামি চিন্তাধারার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। একজন ইমাম ও গবেষককে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত করার মাধ্যমে ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতার সমন্বয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। তার নেতৃত্বে ইসলামিক ফাউন্ডেশন নতুন গতিশীলতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যাবে— এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।