
ইসলামের ইতিহাসে বিদায় হজ ছিল এক মহিমান্বিত ও যুগান্তকারী ঘটনা, যার মাধ্যমে মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)। এই ঐতিহাসিক হজকে সফল, সুশৃঙ্খল ও ফলপ্রসূ করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা, সিদ্দিকে আকবর আবু বকর (রা.)।
তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী, নিবেদিতপ্রাণ সহচর ও উম্মতের জন্য আদর্শ নেতৃত্বের প্রতীক।
বিদায় হজে তাঁর বিচক্ষণতা, আনুগত্য, দায়িত্ববোধ ও ত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। হিজরতের নবম বছরে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার ফলে হজ মূলত হিজরতের দশম বছরে মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের পটভূমি প্রস্তুত করে দেয়। এই হজের মাধ্যমে হজের মৌসুম থেকে জাহেলি যুগের প্রকাশ্য ও অপবিত্র প্রথাগুলো দূর করা হয়।
ফলে যখন মহানবী (সা.) বিদায় হজ পালনের জন্য আগমন করেন, তখন তিনি একটি সুসংগঠিত, পবিত্র ও তাওহিদভিত্তিক হজের পরিবেশ দেখতে পান। তাঁর নেতৃত্বে ঘোষণা করা হয়েছিল, এই বছরের পর আর কোনো মুশরিক হজ করতে পারবে না এবং কেউ নগ্ন অবস্থায় কাবা তাওয়াফ করতে পারবে না। (বুখারি, হাদিস : ৪৬৫৫)
হিজরতের দশম বছরে মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে হজের বিধি-বিধান, মানবাধিকারের মৌলিক শিক্ষা এবং ইসলামের সার্বিক দিকনির্দেশনা গ্রহণে পুরোপুরি সমর্থ হয়। এখানেই আবু বকর (রা.)-এর হজের প্রস্তুতিমূলক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁর হজ ছিল আহ্বান, পরিশুদ্ধি ও সাংগঠনিক সংস্কারের হজ; আর বিদায় হজ ছিল পূর্ণতা, ব্যাখ্যা ও চূড়ান্ত দিকনির্দেশনার হজ। প্রথম হজে ঘোষণা করা হয়েছিল যে কাবার আনুষ্ঠানিকতায় আর কোনো মুশরিকের অংশগ্রহণ থাকবে না। আর বিদায় হজে মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের হজের আনুষ্ঠানিকতা আমার কাছ থেকে শিখে নাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২৯৭)
মূলত, তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে মহানবী (সা.) রমজান, শাওয়াল ও জিলকদ মাসের অবশিষ্ট সময় মদিনায় অবস্থান করেন। এরপর হিজরতের নবম বছরে তিনি আবু বকর (রা.)-কে মুসলমানদের হজের আমির নিযুক্ত করেন।
সে সময় আরব সমাজ মূলত তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল—মুসলিম, মুশরিক ও চুক্তিবদ্ধ গোত্রসমূহ। অনেক আরব তখনো জাহেলিয়াতের যুগের বিভিন্ন রীতি-নীতি আঁকড়ে ধরে হজে অংশ নিত। এমনকি কেউ কেউ নগ্ন অবস্থায় কাবা তাওয়াফের মতো লজ্জাজনক প্রথাও অনুসরণ করত। এ পরিস্থিতিতে আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে হজ পরিচালনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ইসলামের অধীনে হজের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং মুশরিক ও চুক্তিবদ্ধদের ব্যাপারে আল্লাহর চূড়ান্ত বিধান ঘোষণার পথ প্রস্তুত হয়। সিরাতের গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে যে আবু বকর (রা.) একদল সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে কোরবানির পশুসহ হজের উদ্দেশে রওনা হন। মহানবী (সা.) নিজেও তাঁর সঙ্গে কোরবানির পশু পাঠিয়েছিলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা-৫৪৩)