জনতার হাতে আইন গেলে রাষ্ট্র অসহায়

ইকরাম কবীর
  ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:১৭

মব সন্ত্রাস দূর করা যায়নি। যা শুরু হয়েছিল, সেই সংস্কৃতি রয়ে গেছে। এটি এক ম্যানিয়াতে রূপ নিয়েছে। আমাদের কাছে এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো উন্মত্ততা মনে হচ্ছে না। এই সন্ত্রাস আজ সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমরা আইন প্রয়োগের অপেক্ষা আর করছি না; নিজেই আইন হয়ে উঠছি।
একজন মানুষ, সে পীর হোক বা না হোক; সে কথিত হোক বা আসল হোক, তাকে কুপিয়ে মেরে ফেলার অর্থ হচ্ছে একজন মানুষকে মেরে ফেলা, রক্ত ঝরানো। এই রক্তমাখা বাস্তবতা নিয়ে এখন আমাদের পথচলা। আমরা কি এখন মানুষকে বস্তুতে পরিণত করেছি? আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং একটি সমাজের নৈতিক স্খলন যখন শুরু হয়, তখন সেই সমাজের অধঃপতন কেউ থামাতে পারে না। 
একটি পরিসংখ্যান দেখা যাক।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর– এই ১১ মাসে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। এই সংখ্যাকে যদি আমরা শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে দেখি, তাহলে আমাদের মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। কারণ প্রত্যেক নিহত মানুষ একটি জীবন, একটি পরিবার; সামাজিক সম্পর্কের কেন্দ্র। ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, এসব হত্যার বেশির ভাগই ঘটেছে প্রকাশ্যে। তার অর্থ, এখন আমরা আর লুকিয়ে লুকিয়ে খুন করছি না। যারা করছে, তারা জানে– তাদের কিছু হবে না।
মব সন্ত্রাসের শিকার সবচেয়ে বেশি হয়েছে ঢাকায়। রাষ্ট্রের কেন্দ্রে। যে শহরে সবচেয়ে বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকার কথা, সেখানেই যদি মানুষ মবের হাতে মারা যায়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর নির্দিষ্ট কোনো প্যাটার্ন নেই। কখনও ধর্মীয় অনুভূতির অভিযোগ, কখনও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণ, কখনও সামাজিক গুজব, আবার কখনও একেবারে তুচ্ছ কোনো ঘটনা। কয়েক মাস আগে ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে যেভাবে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, তা এই সমাজের ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। একটি সড়ক দুর্ঘটনা, যার আইনি সমাধান হওয়ার কথা ছিল, তা কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি সন্ত্রাসে রূপ নিল। কেউ প্রশ্ন করল না, কেউ থামাল না। কেউ বলল না– এই মানুষকে মেরে ফেলার অধিকার কারও নেই।
এই প্রশ্নই আসলে মব সন্ত্রাসের কেন্দ্রে। আমরা নিজেরা বিচারকের ভূমিকা নিচ্ছি কেন? এই ক্ষমতা আমরা কোথা থেকে পেলাম? এই ক্ষমতার উৎস আসলে বিচারহীনতা। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখেছি, খুন, নির্যাতন, আগুন, ধর্ষণ। কিন্তু বিচারের গতি অত্যন্ত ধীর কিংবা হচ্ছেই না। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের নিশ্চিত করতে পারে না– অন্যায় করলে শাস্তি হবে, তখন মানুষ নিজেই আইন হাতে তুলে নিতে চায়। কিন্তু এই ‘নিজের হাতে বিচার’ শেষ পর্যন্ত অপরাধকেই সামাজিক বৈধতা দিচ্ছে।
এই সন্ত্রাসের আরেকটি ভয়ংকর দিক হচ্ছে, এটি ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। আমরা খবর পড়ছি, ভিডিও দেখছি, কিছুক্ষণের জন্য ক্ষুব্ধ হচ্ছি, তারপরই ভুলে যাচ্ছি। রাষ্ট্রের আচরণও একই রকম– ঘটনা ঘটলে বিবৃতি আসে, তদন্ত কমিটি হয়, তারপর নীরবতা। এই নীরবতাই মবকে বার্তা দেয়– তোমরা এই সন্ত্রাস চালিয়ে যেতে পার; তোমাদের কিচ্ছু হবে না। এই উপলব্ধিই একটি সমাজকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার শূন্যতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুনর্গঠন করে তাদের পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই বিষয়ে কতটা কাজ হচ্ছে, আমরা ঠিক জানি না। এর কিছু প্রমাণ রাষ্ট্রের দেখানো প্রয়োজন আমাদের।
এসব সন্ত্রাসী ঘটনা শুধু শারীরিক সহিংসতা নয়; এগুলো একটি গভীর মানসিক বৈকল্যও বটে। এটি আমাদের শেখাচ্ছে– প্রমাণ দরকার নেই; শুধু সন্দেহ অভিযোগই যথেষ্ট মানুষ মেরে ফেলার জন্য। ‘ও চোর’, ‘ও নাস্তিক’, ‘ও অন্য দলের’– এ শব্দগুলো শুনলেই আমরা যেন পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমার আপনার মতো মানুষই দল বেঁধে আরেকজন মানুষকে পিটিয়ে-কুপিয়ে-গুলি করে মেরে ফেলছে। এসব ঘটনাকে মানসিক বৈকল্য ছাড়া আর কী বলা যায়!
আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতো। এই সন্ত্রাসী মনোভাব কি সত্যিই স্বতঃস্ফূর্ত? নাকি একে উস্কে দেওয়া হচ্ছে? নির্দিষ্ট স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর সহিংসতা– সবই ‘জনতার ক্ষোভ’, ‘প্রেশার গ্রুপ’-এর নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই জনতার পেছনে কে বা কারা? এই সহিংসতায় কারা লাভবান হয়? কেউ যদি এর পেছনে থেকে থাকে, তাহলে তারাও ম্যানিয়াগ্রস্ত, মানসিক বৈকল্য আছে।
এগুলোর সমাধান আছে, কিন্তু তা সহজ নয়। প্রথমত, এই সন্ত্রাসকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিচয় বাছবিচার না করে প্রতিটি মব সহিংসতায় দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সন্ত্রাসের নিন্দা করতে হবে; এমনকি নিজ দলের কর্মী হলেও।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র নাগরিকদের পাশে আসলেই দাঁড়াবে, নাকি উত্তেজিত জনতার ভয়ে নীরব থাকবে? রাষ্ট্র যদি চুপ থাকে, এই সন্ত্রাস বেড়েই চলবে। আর সেই পরিস্থিতিতে আমরা কেউই নিরাপদ বোধ করব না– আজ সে, কাল আপনি, পরশু আমি।
এমন ঘটনা এত ঘটেছে, একে বিচ্ছিন্ন সমস্যা বলে আর মনে করা ঠিক হবে না। এটি আমাদের সমাজের নৈতিক স্বাস্থ্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ। এই পরীক্ষায় আমরা ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। সময় এখনও আছে। এত বড় এক জনগোষ্ঠী সামলাতে সময় লাগে। তবে বেশি দীর্ঘ সময় নেওয়া ঠিক হবে না। আমরা যেন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অনুধাবন করতে পারি, সেদিকে খেয়াল রাখা খুব জরুরি।
ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক
[email protected].
সূত্র: সমকাল