
তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। এ নৌপথ দিয়েই পৃথিবীর ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জ্বালানি এ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের অন্যান্য অংশে যায়। শুধু কি জ্বালানির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালি, এমন প্রশ্ন করলে উত্তর হবে, ‘না’। কারণ, এ নৌপথটি ১০ কোটি মানুষর খাবারের লাইফলাইন। খবর সিএনএন।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অনেকটা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। বন্ধ রয়েছে তেলবাহী ট্যাংকার ও খাদ্যবাহী জাহাজ চলাচল। যুদ্ধের জেরে উপসাগরীয় দেশগুলোর খাদ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কঠোর জলবায়ুতে টিকে থাকা সহজ নয়, এর জন্য যথেষ্ট প্রচেষ্টা লাগে। গ্রীষ্মে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও (১২২ ফারেনহাইট) বেশি হয়। এ অঞ্চলে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই নগণ্য। তাই তো অধিকাংশ খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এমনকি, অঞ্চলটিতে সুপেয় পানির চরম অভাব। আরব দেশগুলোর পানীয় জলের বেশিরভাগই সমুদ্র থেকে সংগৃীহত। পানি পরিশোধন করে মানুষদের দেয় দেশগুলোর সরকারেরা।
সৌদি আরব নিজেদের মোট খাদ্যের ৮০ শতাংশ আমদানি করে। ৯০ শতাংশ আমদানি করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আর কাতার আমদানি করে নিজেদের চাহিদার মোট খাদ্যের ৯৮ শতাংশ। এছাড়া ইরাকও প্রচুর খাদ্য আমদানি করে। এসব দেশের বেশিরভাগ খাদ্যবাহী জাহাজ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে।
সামগ্রিকভাবে এ অঞ্চলে আসা খাদ্যবাহী জাহাজগুলোর অধিকাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কারণে এখন নৌপথটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে রয়েছে। জলপথটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাদ্য পরিবহনকারীরা বিকল্প পথ খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছে। অন্য পথে জাহাজ চলাচলে খরচ অনেক বেশি। এর ফলে খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে, যা গিয়ে সরাসরি পড়বে ভোক্তাদের ওপর।
এমনকি, ইরানও তার বাণিজ্যের বড় একটি অংশের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে জানিয়েছে, খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে গুরুতর বিঘ্নের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ডব্লিউএফপির ডেপুটি নির্বাহী পরিচালক কার্ল এসকেআউ বলেন, “শিপিং খরচ বাড়ছে খুব দ্রুত।”
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে তাৎক্ষণিক কোনও খাদ্যসংকট না থাকলেও এ সংঘাত সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেছে। সংকটের সমাধান না হলে একপর্যায়ে গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো খাদ্য সংকটে পড়বে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ফল ও সবজি বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠান কিবসনস ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর ৫০ হাজার খাদ্য আমদানি করে থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে খাদ্য আমদানি করা প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তারা খাদ্য আনতে ভিন্ন রুটের কথা চিন্তা করছে।
কিবসনস ইন্টারন্যাশনালের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক ড্যানিয়েল ক্যাবরাল বলেন, “এ মুহূর্তে সাপ্লাই চেইন খুবই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।”
বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ নিরাপদ রাখতে কাজ করা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস’র (ইউকেএমটিও) তথ্য মতে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত দুই ডজন জাহাজে হামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে কার্গো জাহাজও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনও জাহাজ কোম্পানি ঝুঁকি নিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে ইচ্ছুক না।
আরেকটি ইস্যু হল, সাগরে থাকা জাহাজের পরিমাণ নিয়ে। ক্যাবরাল বলেন, “কিবসনস ইন্টারন্যাশনালের কয়েক টন খাদ্য জাহাজে রয়েছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালির বাইরে অপেক্ষমাণ। এসব জাহাজ কবে নাগাদ বন্দরে পৌঁছাবে তার কোনও নির্দিষ্ট সময় বলা যাচ্ছে না।”
ক্যাবরাল বলেন, “শিপিং চুক্তির সূক্ষ্ম শর্তাবলীর মধ্যে ‘যুদ্ধকালীন ধারা’ অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা এখন কার্যকর হয়েছে। এ ধারাগুলো জাহাজকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করা থেকে সুরক্ষা দেয় এবং পণ্য নামানোর জন্য গন্তব্য বন্দর বেছে নেওয়ার অধিকার দেয়।”
কিবসনসের একটি কনটেইনার দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে, যুদ্ধের জেরে সেটি এখন ভারতের মুন্দ্রায় রয়েছে। আরেকটি রয়েছে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে। ক্যাবরাল বলেন, “আমরা এখন কি করতে চাই তা শিপিং কোম্পানি জানতে চেয়েছে। ভারতে থাকা জাহাজটির পণ্য আমরা সেখানেই বিক্রি করতে চায় কিনা তারা জানতে চেয়েছে। আমরা খুব কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে গেছি।”
বিমা সংস্থা এবং শিপিং কোম্পানিগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি।
ক্যাবরাল জানান, শিপিং কোম্পানিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাওয়া প্রতি কনটেইনারের জন্য অতিরিক্ত চার হাজার ডলার চার্জ আরোপ করেছে। তিনি বলেন, “স্থলপথে ট্রাকিং ও লজিস্টিক খরচ প্রতি কনটেইনারে চার থেকে ৯ হাজার ডলার।”
ক্যাবরাল বলেন, “ইউরোপ থেকে আসা আমাদের কিছু কনটেইনার নিয়ে হিসাব করছিলাম। সাধারণত সমুদ্রপথে ভাড়ার জন্য আমরা প্রায় তিন হাজার ইউরো বা তিন হাজার ৪০০ ডলার দিতাম। কিন্তু, এবার যে কোটেশন এসেছে তাতে দেখানো সাড়ে ১৪ হাজার ইউরো, সেটাও শুধু জেদ্দা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য। এরপর সেখান থেকে আবার ট্রাকে করে নিতে হবে, যার জন্য আরও অতিরিক্ত খরচ লাগবে।”
অতিরিক্ত ব্যয়ের এ প্রভাব সবশেষে গিয়ে পড়বে ভোক্তাদের ওপর। নিজেদের ২০ শতাংশ পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ক্যাবরাল। এর মধ্যে রয়েছে ডেইরি ও তাজা ফল। তিনি বলেন, “আমাদের গুদামে এখনও এক মাসের খাদ্য মজুত রয়েছে।”
আকাশপথে পণ্য পরিবহনও এ অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন। তবে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এটিও নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার প্রতিক্রিয়ায় হামলা চালায় ইরান। এর জেরে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ৪৮ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়। এর প্রভাব পড়ে যাত্রী পরিবহন ও কার্গো শিপমেন্টে।
গত সোমবারও এ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দুবাই সিভিল ডিফেন্স। ইরানি ড্রোনের আঘাতের জেরে সৃষ্ট আগুনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৯২৪ সাল থেকে এ অঞ্চলে খুচরা ব্যবসা করে আসছে স্পিনিস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নিজেদের সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বেশ আশাবাদী তারা। স্পিনিসের সরবরাহ ডিপার্টমেন্টের প্রধান লুইস বোথা বলেন, “আমরা ক্ষুধার্ত থাকবো এমন কোনও পথ খোলা নেই।”
লেবানন ও মিশরের মতো বাজারে এর আগে এমন সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল স্পিনিস। বর্তমানে কোম্পানিটি উপসাগরীয় অঞ্চলে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বিকল্প পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকছে তারা। স্পিনিস যুক্তরাজ্য থেকে ফ্রান্স হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত খাদ্যবাহী কনটেইনার ট্রাকে পরিবহনের পরিকল্পনা করছে। এরপর সেগুলো ইরাক, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হবে।
বোথা বলেন, “আমরা আসলে সড়কপথে প্রায় ১২ দিনের মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে সরাসরি জেবেল আলি গুদাম পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করতে পারি। একটানা গাড়ি চালালে এটি প্রায় ৭২ ঘণ্টায়ও সম্ভব।” আকাশপথে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমানে বিমানযোগে পণ্য আনার চেয়ে সড়কপথে আনা ৪০ শতাংশ সস্তা হবে।”
ইরান যুদ্ধে সৃষ্ট বিঘ্নগুলোর ধারাবাহিক প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়বে, যা তাদের জন্য মোটেও ভালো নয়। এর প্রতিক্রিয়ায় গালফ করপোরেশন কাউন্সিলভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর সরকার জটিলতা কমানোর চেষ্টা করছে।
এমন পরিস্থিতিতে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি নতুন বাণিজ্য করিডর চালু করেছে, যা মাসকট ও জেবেল আলির মতো বন্দরগুলোর মধ্যে পণ্য ছাড়পত্র প্রক্রিয়া দ্রুততর করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মীড বলেন, “আপনি যথেষ্ট অর্থ দিতে রাজি থাকলে বিমা পাওয়া যায়।” তবে তিনি মনে করেন, সেটাই আসল সমস্যা নয়। তিনি বলেন, “এখানে নিরাপত্তাই মুখ্য। বিষয়টি তুলে ধরা উচিত।”
সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিটিকে সামরিকভাবে নিরাপদ করার আলোচনা বেড়েছে। বিশেষ করে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএস ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনকে শিপিং কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্ব দেন। এমনকি, মার্কিন নৌবাহিনীর এসকর্ট দেওয়ার সম্ভাবনাও উত্থাপন করেন।
রিচার্ড বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর এসকর্ট শিগগিরই আসছে না এটা এক প্রকার সিউর। যখন সামরিক সহায়তা আসবে তখন তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে প্রায়োরিটি দিতে হবে।”