ইরানে হামলার প্রস্তুতি

ট্রাম্পকে নিজের চেয়ার বাঁচানোয় মনোযোগ দিতে বলছেন সহকারীরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১৪

ইরানে আগ্রাসন চালানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ইতিহাসের ব্যবহুল পদক্ষেপ নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইতোমধ্যে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী এমন প্রস্তুতি নিয়েছে যা ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার আগের প্রস্তুতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। যেকোনো সময় ট্রাম্পের হুকুম পেলেই মার্কিন যুদ্ধবিমান উড়াল দেবে তেহরানের দিকে এবং ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে আছড়ে পড়বে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভূমিতে। 
আয়াতুল্লা আলী খামেনির দেশকে যেকোনো মূল্যে হাতের মুঠোয় আনতে এবং দেশটির শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা রেজিম চেঞ্জ চান ট্রাম্প। কিন্তু তার সহকারীরা বলছেন ভিন্ন কথা। খামেনির চেয়ে ট্রাম্পের ক্ষমতা বেশি নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। 
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন, এই ভোটযুদ্ধে ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকানদের পরাজয়ের আশঙ্কা প্রতিনিয়ত ঘনীভূত হচ্ছে। কারণ, ট্রাম্প একের পর এক বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কিত হচ্ছেন, সর্বশেষ শুক্রবার দেশটির আদালত বিশ্বব্যাপী আরোপ করা শুল্কও অবৈধ ঘোষণা করে দিয়েছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং মার্কিনিদের জীবনযাত্রার মানের ক্রমাবনতি রিপাবলিকানদের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিচ্ছে। 
আর আসন্ন নির্বাচনে সত্যিই যদি ট্রাম্পের দল হেরে যায়, তাহলে মুকুটহীন রাজায় পরিণত হবেন তিনি। এমনকি তাকে অভিশংসনও করা হতে পারে বলে ট্রাম্প নিজেই বারবার প্রকাশ্যে বলছেন।
এসব কারণে ট্রাম্পকে ইরানে হামলার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের চেয়ার বাঁচানোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তার সহকারীরা।
রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন, যদিও তার উপদেষ্টারা তাকে ভোটারদের অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার দিকে বেশি নজর দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এটি এই বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর রাজনৈতিক ঝুঁকিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে।
ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সৈন্য সমাবেশ এবং ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কয়েক সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলার প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কেন তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই সবচেয়ে আগ্রাসী পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, তার বিস্তারিত কারণ তিনি মার্কিন জনগণের কাছে এখনো ব্যাখ্যা করেননি।
ইরানের প্রতি ট্রাম্পের এই অতি-নিবিষ্টতা তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৩ মাসের এজেন্ডার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমত জরিপ অনুযায়ী জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো অধিকাংশ মার্কিনির কাছে উচ্চ অগ্রাধিকার পেলেও, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এবং সামরিক শক্তির ব্যাপক ব্যবহার প্রায়শই সেই বিষয়গুলোকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও ইরানের ওপর হামলা চালানোর বিষয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরে এখনো কোনো ‘একীভূত সমর্থন’ নেই।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্পের উপদেষ্টারা সেইসব দোদুল্যমান ভোটারদের কাছে কোনো ‘বিভ্রান্তিকর বার্তা’ না পাঠানোর বিষয়ে সচেতন, যারা অর্থনীতির বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।
এই সপ্তাহে অসংখ্য ক্যাবিনেট সচিবের উপস্থিতিতে একটি ব্যক্তিগত ব্রিফিংয়ে অংশ নেওয়া একজন ব্যক্তির মতে, হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা এবং রিপাবলিকান প্রচার কর্মকর্তারা চান ট্রাম্প অর্থনীতিতে মনোনিবেশ করুন; সেখানে অর্থনীতিকেই নির্বাচনি প্রচারের প্রধান বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ট্রাম্প সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
এসব বিষয়ে হোয়াইট হাউসের দ্বিতীয় একজন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ‘সরাসরি মার্কিন জনগণের জন্য বিজয় বয়ে এনেছে।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রেসিডেন্টের সব পদক্ষেপই 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতিকে প্রাধান্য দেয়—তা সে পুরো বিশ্বকে নিরাপদ করার মাধ্যমেই হোক বা দেশের জন্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনার মাধ্যমেই হোক।
আগামী নভেম্বরের নির্বাচন নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে কিনা। বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের কাছে একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
রিপাবলিকান কৌশলী রব গডফ্রে বলেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ট্রাম্প এবং তার সহকর্মী রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক বিপদ ডেকে আনতে পারে।
গডফ্রে বলেন, প্রেসিডেন্টকে সেই রাজনৈতিক ভিত্তির কথা মাথায় রাখতে হবে, যারা তাকে টানা তিনবার রিপাবলিকান মনোনয়ন পেতে সাহায্য করেছে এবং এখনো তার পাশে আছে। এই গোষ্ঠীটি বৈদেশিক সংঘাত এবং বিদেশের মাটিতে জড়ানোর বিষয়ে সন্দিহান, কারণ 'চিরস্থায়ী যুদ্ধের' অবসান ঘটানো ছিল তার একটি সুস্পষ্ট নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি।
রিপাবলিকানরা গত বছর কংগ্রেস কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তিগত ট্যাক্স কাট (কর ছাড়), সেইসঙ্গে আবাসন এবং কিছু প্রেসক্রিপশন ওষুধের দাম কমানোর কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে নির্বাচনি প্রচার চালানোর পরিকল্পনা করছেন।

ভেনেজুয়েলার চেয়েও শক্তিশালী শত্রু
কিছু ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের বিচ্ছিন্নতাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের অনেকেই গত মাসে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার আকস্মিক অভিযানকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন, তবে তাকে আরও বেশি বাধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। কারণ, ইরান ভেনেজুয়েলার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে বারবার হামলার হুমকি দিয়ে আসা ট্রাম্প শুক্রবার আবার তার সতর্কবার্তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, তেহরানের জন্য ‘একটি ন্যায্য চুক্তিতে আলোচনা করাই শ্রেয়।’
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল এবং ইরান পাল্টা হুমকি দিয়েছে যে, পুনরায় আক্রান্ত হলে তারা ভয়াবহ প্রতিশোধ নেবে।
২০২৪ সালে ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' প্ল্যাটফর্মে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মুদ্রাস্ফীতি কমানো এবং ব্যয়বহুল বৈদেশিক সংঘাত এড়ানোর প্রতিশ্রুতি। তবে জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে যে, উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন বলে মার্কিনিদের বিশ্বাস করানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
তা সত্ত্বেও, রিপাবলিকান কৌশলী লরেন কুলি মনে করেন, ট্রাম্পের সমর্থকরা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করতে পারে যদি সেটি চূড়ান্ত এবং সীমিত পরিসরে হয়।
তিনি বলেন, ‘যেকোনো পদক্ষেপকে মার্কিন নিরাপত্তা রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে হোয়াইট হাউসকে স্পষ্টভাবে সম্পর্কিত করতে হবে।’
তা সত্ত্বেও, জনমত জরিপে বিদেশের মাটিতে আরেকটি যুদ্ধের প্রতি জনগণের সামান্য আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগ পুরোপুরি নিরসনে ট্রাম্প যেখানে খেই হারিয়ে ফেলছেন, সেখানে ইরানের সঙ্গে যেকোনো উত্তেজনা বৃদ্ধি করা ওই প্রেসিডেন্টের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে—যিনি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার দল কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে ট্রাম্পের পরিণতি কী হতে পারে
২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়, তবে তার প্রেসিডেন্সির ওপর এর সুদূরপ্রসারী ও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। 
এর মধ্যে শীর্ষে আছে অভিশংসনের ঝুঁকি। ট্রাম্প নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ডেমোক্র্যাটরা তাকে ‘অভিশংসন’ বা ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। তিনি গত মাসে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমাদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিততেই হবে, অন্যথায় তারা আমাকে অভিশংসন করার কোনো না কোনো কারণ খুঁজে বের করবে।’
আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা আসতে পারে। বর্তমানে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই (সিনেট ও হাউস) সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু নির্বাচনে হারলে ট্রাম্পের অনেক রাজনৈতিক ও আইনি এজেন্ডা থমকে যেতে পারে। বিশেষ করে তার ট্যাক্স কাট (কর ছাড়) বা অন্যান্য বিতর্কিত বিল পাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এছাড়া সংসদীয় তদন্তের মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাটরা যদি হাউসের নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের ওপর কড়া নজরদারি শুরু করতে পারবে। এর ফলে বিভিন্ন সংসদীয় তদন্ত, শুনানি এবং সাক্ষ্য দেওয়ার তলব জারির মাধ্যমে প্রশাসনকে রক্ষনাত্মক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হতে পারে।
একই সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন হয়ে যাবে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে যে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারায়। ২০২৬ সালের নির্বাচনটি ট্রাম্পের প্রথম দুই বছরের কাজের ওপর একটি ‘গণভোট’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভোটাররা যদি জীবনযাত্রার ব্যয় বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকেন, তবে তার প্রভাব সরাসরি ব্যালট বাক্সে পড়বে।
সুদূরপ্রসারী চিন্তা করলে ২০২৮ সালের নির্বাচনেও পড়বে মারাত্মক প্রভাব। যদিও ট্রাম্প ২০২৮ সালে নিজে প্রার্থী হতে পারবেন না, তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে রিপাবলিকান পার্টির ওপর তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ‘কিংমেকার’ হিসেবে তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।