
শ্রী রতনেশ্বর কুমার। পেশায় রাজমিস্ত্রি। কাজে যাওয়ার পথে বেওয়ারিস কুকুরের কামড়ে গুরুতর আহত হন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে হয় গভীর ক্ষত। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তাকে নিয়ে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে ছিল না জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন। রেফার্ড করে পাঠানো হয় জেলা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানেও একই উত্তর, ‘ভ্যাকসিন নেই’।
শুরু হয় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ। ফার্মেসি থেকে বেসরকারি ক্লিনিক কোথাও নেই ভ্যাকসিন! ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পার হওয়ার পর চড়া দামে একটি ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেন। কিন্তু ততক্ষণে রোগীর অবস্থা কাহিল। অবশেষে জলাতঙ্কে আক্রান্তের ১৪ দিন পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান চিকিৎসাধীন রতনেশ্বর কুমার।
শুধু তিনি নন, ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে একই পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। গত ২২ এপ্রিল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি ও কঞ্চিবাড়ি গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী ছাপরহাটী ইউনিয়নের মন্ডলেরহাট গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
একই কুকুরের কামড়ে দুই শিশু ও দুই নারীসহ মোট ১৩ জন গুরুতর আহত হন। কুকুরের কামড়ে র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬ মে মারা যান কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫) ও কঞ্চিবাড়ি গ্রামের নাইব উদ্দিনের ছেলে ফুলু মিয়া এবং ৮ মে মারা যান রতনেশ্বর কুমার।
অন্যদিকে আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মতিয়ার রহমানের স্ত্রী আফরোজা বেগমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে ঢাকায়। নারী-শিশুসহ ৯ জন আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারগুলোর।
‘কুকুর কামড়ানোর পরপরই ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ক্ষতস্থানগুলো ড্রেসিংয়ের পর জানানো হয় ভ্যাকসিন নেই। এরপর জেলা হাসপাতালে ছুটে যাই, সেখানেও একই কথা। বাধ্য হয়ে ওষুধের দোকান, বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। কিন্তু কোথাও ভ্যাকসিন মেলেনি।’
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা না হলে হতে পারে আরও প্রাণহানি। আক্রান্তদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতেই কেটে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করলেও ততক্ষণে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে র্যাবিস ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে।
নিহত রতনেশ্বরের ভাই রবিন্দ্র কুমার অভিযোগ করেন, ‘কুকুর কামড়ানোর পরপরই ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ক্ষতস্থানগুলো ড্রেসিংয়ের পর জানানো হয় ভ্যাকসিন নেই। এরপর জেলা হাসপাতালে ছুটে যাই, সেখানেও একই কথা। বাধ্য হয়ে ওষুধের দোকান, বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। কিন্তু কোথাও ভ্যাকসিন মেলেনি।’
মন্ডলেরহাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, ‘মানুষ হাসপাতালে ছুটে যায়, কিন্তু ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। এখন তিনজন মারা গেছে, আমরা ভয় আর আতঙ্কে আছি।’
কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তাজরুল ইসলাম বলেন, বছর খানেক আগে জলাতঙ্কে তার এলাকায় দুজন মারা গেছেন। ভ্যাকসিন না থাকায় সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায়নি তাদের।
তার দাবি, সরকারি হাসপাতালে যদি পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকত, এই মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত।
তবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দিবাকর বসাক বলেন, ‘আমাদের এখানে আক্রান্তদের কেউ চিকিৎসা নেয়নি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ ছিল না। এ মাসে ৩০টি জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছি। এসব ভ্যাকসিন জেলা হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়।’
‘মানুষ হাসপাতালে ছুটে যায়, কিন্তু ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। এখন তিনজন মারা গেছে, আমরা ভয় আর আতঙ্কে আছি।’
সরেজমিনে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে টিকিট সংগ্রহ করে জলাতঙ্ক আক্রান্ত তিনজন রোগী ভ্যাকসিন নিতে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু হাসপাতালে ডগবাইট রুমে তালা ঝুলছে। প্রায় আধা ঘণ্টা পর একজন এসে রুমের তালা খুললেন। রোগীরা জলাতঙ্ক রোগে ভ্যাকসিন পুশ করতে চান। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন হাসপাতালে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই। বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। পরে তারা বাইরে দোকান থেকে কিনে নিয়ে এসে শরীরে পুশ করে নেন।
এসময় জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার সাবদিন গ্রাম থেকে টিকা নিতে আসা মো. বিশাল তালুকদার (২৬) বলেন, ‘গতকাল বিড়াল আঁচড় দিয়েছিল। আজ হাসপাতালে টিকা নেওয়ার জন্য এসেছি। এসে শুনি ভ্যাকসিন শেষ।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা থেকে টিকা নিতে আসা তাসপিয়া (১৮) বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে কোনো ওষুধই পাওয়া যায় না। যে হাসপাতালে সামান্য কুকুর-বিড়াল কামড়ালে চিকিৎসা পাওয়া যায় না, সেখানে আরও জটিল রোগের চিকিৎসা মানুষ কীভাবে পাবে!’
জলাতঙ্ক আক্রান্ত এক রোগী বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে হাসপাতালে যাওয়াত খরচ ১৬০ টাকা। কত কাজ ফেলে আসছি। এখানে এসে শুনি ভ্যাকসিন নেই। তাহলে ঘোষণা দিয়ে বলে দিলেই হয়, হাসপাতালে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয় না।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত চার মাসে ১৫১৭ জন জলাতঙ্ক রোগীকে হাসপাতালে ভ্যাকসিন পুশ করা হয়েছে। এরমধ্যে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন পেয়েছেন ৮০০ জন। আর বাকিরা কিনে এনে শরীরে পুশ করেছেন।
এদিকে রোগীর স্বজনদের দাবি, হাসপাতালটির ঊর্ধ্বতন কর্তারাই এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তত্ত্বাবধায়ক কোটি টাকার বিনিময়ে তার ইচ্ছামতো ঠিকাদারকে ওষুধ কেনার দায়িত্ব দেন। আর ঠিকাদার ওষুধ সরবরাহ না করে সরকারি টাকা হাতিয়ে নেন।
‘আমার বাড়ি থেকে হাসপাতালে যাওয়াত খরচ ১৬০ টাকা। কত কাজ ফেলে আসছি। এখানে এসে শুনি ভ্যাকসিন নেই। তাহলে ঘোষণা দিয়ে বলে দিলেই হয়, হাসপাতালে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয় না।’
হাসপাতালের ডগ বাইট ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম বলেন, আজ (১১ মে) থেকে হাসপাতালের ভ্যাকসিন শেষ হয়েছে। আগামী দুই-তিনদিনের মধ্য আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
টাকা দিলেই ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, না হলে বলা হয় শেষ- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মানুষের মুখ বন্ধ করা যাবে না। তাই কে কী বললো এগুলো আর শুনি না।’
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক ডা. মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমার সব বিষয়ে এতো খোঁজ নেওয়ার সুযোগ নাই।’
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স অনুষদের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেদ হোসাইন বলেন, জলাতঙ্ক রোগের র্যাবিস ভ্যাকসিন ছাড়া কোনো ওষুধ নেই। এ রোগ স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিস্কে আঘাত করে। মস্তিষ্কে দ্রুত আঘাত করলে রোগী মারা যায়। সেজন্য প্রাণীর শরীরের স্থানে কামড়ের ওপর নির্ভর করে। জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর-বিড়াল মানুষের কোমরের নিচে কামড় দিলে, মস্তিষ্কে পৌঁছাতে সময় লাগে। আর ঘাড় মাথার কাছাকাছি কামড় দিলে রোগী মারা যায়। কারণ ভাইরাসটি দ্রুত মস্তিষ্কে আঘাত করে। এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ সময় লাগে।
তিনি বলেন, দুই সপ্তাহ পর রোগীর জ্বর, মাথাব্যথা, গলা ব্যথা, আক্রান্ত স্থানে (কামড়ের জায়গায়) ব্যথা, চুলকানি, ঝিনঝিন করা, বমি বমি ভাব, অস্বস্তি বা সাধারণ দুর্বলতা অনুভূত হয়। তাই দ্রুত সময়ের মধ্য ভ্যাকসিন পুশ করে শরীরে প্রতিরোধ তৈরি করলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। তাছাড়া জলাতঙ্ক (Rabies)একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় অনিবার্য।