প্রধান সমস্যা- বেকার সমস্যা 

আবদূন নূর
ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২২:২১


এক কোটি বেকারের দু- কোটি হাত 
ধরো হাল তোল পাল করো বাজিমাত ।

বাংলাদেশ সরকারের  বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে নিবন্ধিত বা আনুষ্ঠানিকভাবে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ থেকে ২৭ লাখ। তবে অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, খণ্ডকালীন বা মনমতো কাজ না পাওয়া ও প্রকৃত বেকার মিলিয়ে এই সংখ্যা প্রায় এক কোটি পর্যন্ত হতে পারে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৬ থেকে ২৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৯ লাখ বা প্রতি তিনজন বেকারের একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী বা উচ্চশিক্ষিত। 

বাংলাদেশে কাজ করতে সক্ষম বা শ্রমশক্তির মধ্যে রয়েছে কোটির ওপরে মানুষ, যার একটি বড় অংশ দেশের সামগ্রিক পরিস্হিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন না। 
অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বেকারের সংকীর্ণ সংজ্ঞার কারণে সরকারি পরিসংখ্যানে আসল চিত্র আসে না। বিশ্বব্যাংকের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্মক্ষম তরুণদের একটি বড় অংশ চাহিদামাফিক কাজ বা উপযুক্ত চাকরি পাননি, ফলে প্রকৃত অপ্রাতিষ্ঠানিক বেকার ও কাজের বাইরে থাকা তরুণের সংখ্যা আরও বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায় বাংলাদেশে বেকারের বড় অংশই শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর পাস বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ।শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বেশি, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার তত বেশি। সাধারণ বা কম শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম। এছাড়া পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। বিবিএস-এর হিসাবে পুরুষ বেকারত্বের হার যেখানে ৩% এর কাছাকাছি, নারীদের ক্ষেত্রে তা ৬% এর বেশি। কর্মক্ষম নারীদের বড় অংশই এখনো শ্রমশক্তির বাইরে আছেন অথবা unpaid (মজুরিহীন) পারিবারিক কাজে নিয়োজিত। বিভাগওয়ারি হিসাবশীর্ষে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ । শিল্পকারখানা এবং বেশি জনসংখ্যা থাকায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে বেকারের সংখ্যা সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি।শতকরা বেকারের হার হিসেবে বরিশাল ও খুলনা বিভাগে বেকারত্বের হার জাতীয় হারের চেয়ে কিছুটা বেশি। অন্যদিকে, কৃষিপ্রধান রংপুর বা সিলেট বিভাগে আনুষ্ঠানিক বেকারের হার কিছুটা কম দেখা যায়  । যদিও সেখানে মৌসুমি বেকারত্বের হার বেশি  ।

বেকার সমস্যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় সংকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) বিভিন্ন প্রতিবেদনেও এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।বেকারত্ব ভয়াবহ রূপ নেওয়ার মূল কারণ ও এর প্রভাবগুলো নিচে তুলে ধরা হলো :

গত এক দশকে ৫৩ লাখ তরুণ বেকারত্ব বরণ করেন । বিশ্বব‍্যংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ, প্রায় ৫৩ লাখ তরুণ গত এক দশকে কোনো চাকরি বা উপযুক্ত কাজ পাননি।

বর্তমানে বাংলাদেশে সাধারণ বেকারত্বের হারের চেয়ে স্নাতক ও উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার (১৩.৫%) প্রায় তিন গুণ বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী বের হলেও বাজারমুখী বা ব্যবহারিক দক্ষতার অভাবে তারা চাকরি পাচ্ছেন না, যাকে অর্থনীতিবিদরা "ম্যাচিং ক্রাইসিস" বা যোগ্যতার অমিল বলছেন।

নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অভাবদেশে বেসরকারি খাতে আশানুরূপ নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন শিল্পকারখানা বা কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। সরকারি চাকরির সীমিত পদের বিপরীতে লাখ লাখ প্রার্থীর আবেদন এই তীব্র প্রতিযোগিতাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলেছে।

সামাজিক ও মানসিক প্রভাবদীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ এবং পারিবারিক অশান্তি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি এবং মেধা পাচারের (Brain Drain) মতো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। যার ফলে দেশের বাহিরে অর্থাৎ  বহির্বিশ্বে যাবার প্রবনতা যুবসমাজের মাঝে পরিলক্ষিত হচ্ছে ।

নতুন প্রশাসন বেকারত্বকে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন ।
আগামী ৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

যুবকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রতিটি জেলায় কারিগরি, তথ্যপ্রযুক্তি (IT) এবং ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।

তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে সহায়তার জন্য একটি বিশেষ ‘উদ্যোক্তা সহায়তা তহবিল’   স্টার্ট-আপ ও এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ড গঠন করা হয়েছে।

সর্বোপরি সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করতে পারলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হবে।বেকার সমস্যা শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।


লেখক: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 
১৮ আগস্ট , ২০২৬ মঙ্গলবার , নিউইয়র্ক।