ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে বাংলাদেশের অবদান

আবদূন নূর
ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৭ জুলাই ২০২৬, ২৩:৪৫

১৯৯০-১৯৯১ সালের ইরাক-কুয়েত উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশ মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক যৌথ বাহিনীর অংশ হিসেবে কুয়েত ও সৌদি আরবের পক্ষে সরাসরি অংশগ্রহণ করে এবং কুয়েত পুনর্গঠনে ঐতিহাসিক অবদান রাখে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম কোনো বিদেশী যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে।
ইরাক কর্তৃক কুয়েত আগ্রাসনের পর সৌদি আরব ও কুয়েতকে রক্ষা করার জন্য জাতিসংঘ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক জোটে বাংলাদেশ যোগ দেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রায় ২,৩০০ জন সৈন্য পাঠায়, যারা মূলত সৌদি আরবের সীমান্ত রক্ষা এবং লজিস্টিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যুদ্ধ সমাপ্তির পর ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কুয়েতের মাটিতে “অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠন” (Operation Reconstruction Kuwait – ORK) শুরু করে। বিধ্বস্ত কুয়েতের অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ কন্টিনজেন্ট (BMC) সেখানে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করে, যা বর্তমানেও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অধীনে চলমান রয়েছে ।
পিছু হটার সময় ইরাকি বাহিনী কুয়েতের সমুদ্র সৈকত এবং মরুভূমিতে বিপুল পরিমাণ ল্যান্ডমাইন ও বিস্ফোরক পুঁতে রেখেছিল।
পশ্চিমা দেশগুলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট অত্যন্ত সাধারণ ডিটেক্টর এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ল্যান্ডমাইনগুলো সফলভাবে অপসারণ করে।কুয়েতকে মাইনমুক্ত করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের ৭২ জন বীর সেনা সদস্য প্রাণ হারান এবং ১৫০ জনেরও বেশি সদস্য গুরুতর আহত হন।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কুয়েতের বেসামরিক নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিম সেখানে নিয়োজিত হয়। তারা স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে যুদ্ধাহত ও সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে সেবা প্রদান করে ।
এই যুদ্ধে বাংলাদেশের অবদানের কারণে কুয়েত সরকারের সাথে বাংলাদেশের এক অনন্য ও অবিচ্ছেদ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কুয়েত সরকার প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক ও বেসামরিক জনশক্তি নিয়োগ করে আসছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বিশাল অবদান রাখছে ।
মৃত্যুকূপ মাইনফিল্ডে খালি হাতে লড়াই: ইরাকি বাহিনী কুয়েত ছাড়ার আগে দেশটির মরুভূমি ও বিস্তীর্ণ উপকূলে লাখ লাখ অত্যাধুনিক ল্যান্ডমাইন, বুবি ট্র্যাপ ও বিস্ফোরক পুঁতে রেখেছিল। মার্কিন বা পশ্চিমা বাহিনীগুলো যেখানে যান্ত্রিক ও রিমোট প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করত, সেখানে বাংলাদেশী বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সেনারা সরাসরি ম্যানুয়াল বা হাত দিয়ে মাইন নিষ্ক্রিয় করার মতো বিপজ্জনক পদ্ধতি বেছে নেন।জীবনের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ: কুয়েতকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বাসযোগ্য করতে গিয়ে এবং মাইন বিস্ফোরণের মুখে পড়ে ৭২ জন বাংলাদেশী বীর সেনা সদস্য শাহাদাত বরণ করেন এবং ১৫২ জনেরও বেশি সদস্য গুরুতর আহত বা পঙ্গুত্ব বরণ করেন。 তাঁদের এই আত্মত্যাগকে কুয়েত সরকার সামরিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা বীরত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
কুয়েত মিলিটারি ডেলিগেশন উদ্ধার (স্মরণীয় ঘটনা): বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই পেশাদারিত্বের প্রতি কুয়েতের আস্থা এতটাই গভীর যে, পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কুয়েতি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আল-খুদেরকে বহনকারী একটি হেলিকপ্টার বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে ঘন কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনার মুখে পড়লে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে সফল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। এই ঘটনা কুয়েত সামরিক বাহিনীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও বীরত্বপূর্ণ ইমেজকে পুনর্নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশি সৈন্যদের এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কারণে কুয়েতের মাটিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজও একটি অত্যন্ত সম্মানিত নাম উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিতে একটি বিশাল টার্নিং পয়েন্ট বা মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস তৈরি (সবচেয়ে বড় প্রভাব): যুদ্ধের আগে কুয়েতে বাংলাদেশী শ্রমবাজার সীমিত ছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ কুয়েত সরকার তাদের দরজা বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বর্তমানে কুয়েতে লক্ষাধিক প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মী কর্মরত আছেন, যা প্রতি বছর বাংলাদেশের রিজার্ভ ও অর্থনীতিতে বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স যুক্ত করছে।”কুয়েত ভিশন ২০৩৫” ও নতুন শ্রমবাজার: সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুবাদে কুয়েতের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের জন্য নতুন নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে, যা কুয়েত ভিশন ২০৩৫ (Kuwait Vision 2035) এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির পথ সুগম করেছে।কুয়েত ফান্ডের (KFAED) মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন: যুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশ ও কুয়েতের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় বড় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ খাত, সড়ক ও সেতু নির্মাণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (KFAED) সহজ শর্তে বিপুল পরিমাণ ঋণ ও অনুদান দিয়ে আসছে।দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি: এই সামরিক ও কূটনৈতিক সফলতার ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জন্য দুই দেশ “বাংলাদেশ-কুয়েত বিজনেস ফোরাম” আয়োজন এবং জয়েন্ট ট্রেড কমিটিকে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কগুলোতে কুয়েতের বড় ধরনের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১৯৯০-১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এই যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক জোটে বাংলাদেশের যোগদানের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণরূপে তাঁর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার ফসল ছিলো ।
১৯৯০ সালের আগস্টে ইরাক কর্তৃক কুয়েত আগ্রাসনের পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক জোট গঠন শুরু করে, তখন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কোনো দ্বিধা ছাড়াই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ঘোষণা দেন। এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী একটি সিদ্ধান্ত, কারণ তৎকালীন সময়ে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের সাথে বাংলাদেশের চমৎকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিল এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল।
১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সৈন্য প্রেরণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক দল এবং ইসলামপন্থী দলগুলো তীব্র বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করেছিল।আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর যুক্তি ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে সাদ্দাম হোসেনের মতো এক বন্ধুভাবাপন্ন মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিপন্থী।জামায়াতে ইসলামীসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ ইসলামপন্থী দল এই সৈন্য প্রেরণের কঠোর বিরোধিতা করে। তাদের অবস্থান ছিল দ্বিমুখী: তারা একদিকে কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসনের নিন্দা করেছিল, অন্যদিকে পবিত্র মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে মার্কিন তথা অমুসলিম পরাশক্তির সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছিল।
তবে মজার বিষয় হলো, যুদ্ধ যখন শুরু হয়ে যায় এবং জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ইরাকের বিরুদ্ধে একাধিক প্রস্তাব পাস করে, তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা নরম হয়। তারা সরাসরি বিরোধিতা বাদ দিয়ে উভয় পক্ষকে শান্তি স্থাপনের আহ্বান জানানোর মধ্যে তাদের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ রাখে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই সৈন্য প্রেরণের সুফল (কুয়েত পুনর্গঠন চুক্তি) বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখায় এই বিরোধিতা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট এরশাদ তাঁর শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কুয়েত ও সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ হওয়ায়, ওআইসি (OIC) এবং জাতিসংঘের নীতি মেনে তিনি সৌদি আরব ও কুয়েতের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে, বাংলাদেশ মুসলিম দেশগুলোর সংকটে সরাসরি পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।
যুদ্ধের কারণে কুয়েত ও ইরাক থেকে প্রায় এক লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মী কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা দেয়। রাষ্ট্রপতি এরশাদ বুঝতে পেরেছিলেন যে, কুয়েতের পক্ষে অবস্থান নিলে যুদ্ধ শেষে এই বিশাল জনশক্তির পুনর্বাসন এবং আরও বড় শ্রমবাজার তৈরি সম্ভব হবে। তাঁর এই দূরদর্শী ভাবনার কারণেই যুদ্ধ শেষে কুয়েত পুনর্গঠনে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়।।

উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশের এই অংশগ্রহণ এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ কুয়েতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে ।